Friday 17 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইপনা: হেসে-খেলে পড়ার জায়গা


১০ জানুয়ারি ২০১৮ ০৮:৪৫ | আপডেট: ১৭ মার্চ ২০১৮ ১৮:৫০
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: ছয় বছরের আভিতা। এই বয়সের শিশুরা যেখানে হেসে-খেলে-কথা বলে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখে, সেখানে আভিতা থাকত চুপচাপ। বাবা-মা আর বড় বোন ছাড়া কারো সঙ্গেই স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না, ঘরের এক কোণেই বসে থাকত সে।

কিন্তু সেই আভিতা এখন বোন অঙ্কিকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইকেল চালায়, কখনো কখনো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দাঁড়িয়ে গিয়ে প্যাডেলে পা চালায় গায়ের সব শক্তি দিয়ে। অঙ্কিতা ইচ্ছে করে হেরে যায়— জিতে যায় আভিতা। আর তাতেই যেন পৃথিবীর সব সুখ ছড়িয়ে পড়ে অঙ্কিতার মুখে।

আভিতা-অঙ্কিতার মা ইশিতা সাহা বলেন, ‘ও ব্যথা পেলে আমি যেমন সেখানে একটু ফুঁ দিয়ে দিই; তেমনি এখন ও যদি বোঝে আমি ব্যথা পেয়েছি, তাহলে সে-ও আমাকে ফুঁ দিয়ে দেয়।’

বিজ্ঞাপন

এক শীতের সকালে আভিতার মা যখন এসব কথা বলছিল তখন তা মুখে এসে পড়েছিল জানালার গ্রিলের ফাঁকা দিয়ে আসা রোদেরচ্ছটা, কিন্তু সেই সূর্যের আলোও ম্লান হয়ে যাচ্ছিল তার মুখের হাসিতে।

কেবল আভিতাই নয়, আশফাক আহমেদ আবির ও অর্ক বিশ্বাস নামের আরও দুজন শিশু নতুন বছরের শুরুতে অন্যান্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আর এরা সবাই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু—যাদের বলা হয় অটিস্টিক শিশু। এসব শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষাটা শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা)-এর স্কুলে।

ইশিতা সাহা বলেন, “আভিতা এখন নিজের সব কাজ নিজে করে, গরম ঠাণ্ডা, ব্যথা পাওয়া, আলো-অন্ধকার সব বুঝতে পারে। এমন কী, নিজে নিজে গোসল করে, চুলে শ্যাম্পু করে।” কথা বলতে বলতে গায়ের চাদর দিয়ে চোখ মোছেন ইশিতা সাহা।
“এমন কী আভিতাকে গত ৮ জানুয়ারি অরণী স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। যদিও অরণীর সবচেয়ে ছোটদের জন্য রাখা ‘কলি’ বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু সেটাও যেন বিশ্বজয় করার মতো।”

তবে আরেকটু দক্ষতার জন্য ইশিতা সাহান চান, তার ছোট মেয়েটা ইপনাতেই থাকুক আরও একটা বছর। তিনি বলেন, ‘এখানে আরও কিছু দিন থাকলে মেয়েটা আরেকটু আত্মনির্ভশীল হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ই ব্লকের ইপনাতে গিয়ে দেখা যায় ভবনের ষষ্ঠতলার এই বিদ্যালয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য রয়েছে একটি স্কুল। সকাল ৯টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত। ছোট বাচ্চারা একটায় চলে গেলেও একটু যারা বড় তারা থাকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত। এই স্কুলে বর্তমানে মোট ৩৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। মূলত ৩ থেকে ৮ বছরের শিশুদের জন্য এই স্কুল হলেও ১০ বছরের বেশি শিশুদেরও এখানে ভর্তি করা হয় বলে জানালেন বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক সাঈদা আলী সোমা।
বিদ্যালয়টির কক্ষগুলোতে সাজানো আছে হরেক রকম খেলনা, কার্টুন চরিত্র, নানা ধরনের ছবি দিয়ে। রয়েছে শিশুদের জন্য নানা খেলনা সামগ্রীও। রঙিন সব চেয়ার টেবিলে সাজানো এসব কক্ষে তাসিন, সায়হান, ইয়াশা, আনিতা, দুর্জয়, নির্ঝর, রাইয়ান, অরিশ, শামস, অমিতসহ একেকজন শিশুকে নিয়ে বসে আছেন একেকজন শিক্ষক।

সকাল সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত থেকে দেখা গেল, সকাল নয়টার কিছু সময় পরেই শিশুরা অ্যামেব্লিতে অংশ নিচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে রয়েছেন একজন করে প্রশিক্ষক। ৩৭ জন শিশুর জন্য ছয়টি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রথমে গ্রুপ ওয়ার্ক এবং পরে প্রতিটি শিশুকে নিয়ে পৃথক পৃথকভাবে শিক্ষকরা বসেন। সেখানে বয়স এবং দক্ষতা অনুযায়ী শিশুদেরকে নানা বিষয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

এ বিদ্যালয়ে প্রথমে এবিএ (অ্যাপ্লাইড বিহেবিয়ার অ্যানালাইসিস) করে তার ভিত্তিতে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া বিষয়টি করা হয় জানিয়ে অটিজম ইন্সট্রাক্টর মনিরা আখতার সারাবাংলাকে বলেন, ‘শিশুদের সামর্থ্য অনুযায়ী, তাদের দক্ষতা-দুর্বলতা চিহ্নিত তার জন্য কী প্রয়োজন, কীভাবে প্রয়োজন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রধান শিক্ষক সাঈদা আলী সোমা বলেন, ‘প্রচলিত সিলেবাস অনুযায়ী এসব শিশুদের সিলেবাস নয়। যে বাচ্চারা লেখাপড়া করতে পারে তাদেরকে নার্সারি, ক্লাস ওয়ান হুবহু কারিকুলাম ফলো না করা ওখান থেকে অনেক কিছু নিয়েই তাদের জন্য আমরা কারিকুলাম তৈরি করি। একাডেমিক স্কিল একটা ডোমেইন আছে, সেই অনুযায়ী ওদের জন্য কাজ করা হয়।’ অর্থাৎ প্রতিটি বাচ্চার প্রয়োজন বুঝে তার জন্য ডোমেইন তৈরি করা হয় বলেন তিনি। এখানে শিশুরা হেসে খেলে লেখাপড়া করে।

তিনি বলেন, ‘অটিজম শিশুদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা বেশিরভাগই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে না, ডাকলে সাড়া দেয় না, নিজের জগতে থাকতেই তারা পছন্দ করে, অনেক শিশু নন ভোকাল, চোখে চোখে তাকাতে সমস্যা, একটা খেলনা নিয়ে নিজের মতো করে খেলতে থাকে— বোধটা ঠিক তাদের কাজ করে না, চেতনাগত সমস্যা থাকে— এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই কাজ করছি আমরা। ডেইলি লিভিং, স্পিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন, কগনিটিভ, অ্যাকটিভিস, খেলাধুলা, সেলফ স্কিল, অ্যাকাডেমিক— এভাবে তার দক্ষতা, ইন্টারেস্টএর পছন্দ, অপছন্দের ভিত্তিতে তাদের শিক্ষাদানের বিষয়টি মাথায় রাখি আমরা।’
আইপি (ইনডিভিজুয়াল আইডিয়াল প্ল্যান) তৈরি করা হয় এবং সে অনুযায়ী তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে এই স্কুলে। ছবির মাধ্যমে, কথা বলে, ছড়া-কবিতা এসবই হচ্ছে আমাদের শিক্ষা দেওয়ার প্রধান উপকরণ।

আইপি অনুযায়ী শিশুদেরকে তাদের প্রাত্যহিক জীবন, সামাজিক দক্ষতার বিষয়গুলো এখানে শেখানো হয়। আর যেহেতু এই বিদ্যালয়টি যেহেতু ১০ বছর বয়সের নিচের শিশুদের জন্য তাই এখানে সেভাবে এখনো কারিগরি শিক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য না পেলেও আগামী কিছুদিনের মধ্যে এ বিষয়েও জোর দেওয়া হবে বলে সারাবাংলাকে বলেন অটিজম ইন্সট্রাকটর মনিরা আখতার। তিনি বলেন, ‘আর কিছুদিনের মধ্যে যাদের বয়স একটু বেশি এবং অন্যদের তুলনায় কিছুটা ম্যাচিরিউড তাদের জন্য ব্লক, বাটিক, কম্পিউটার শিক্ষাসহ কিছু বিষয়ে জোর দেওয়ার চেষ্টা করছি। ’

শুরুতে এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালের জুলাই সেন্টার ফর নিউরো ডেভলপমেন্ট অ্যান্ড অটিজম (সিনাক) নামে চালু হয় এবং তখন ছিল ডেকেয়ার সেন্টার এবং স্কুল। পরে ২০১৪ সালে ইপনা নামে এই প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম শুর হয়। এখানে এখন একজন প্রধান শিক্ষক, তিনজন অ্যাডুকশনাল সাইকোলজিস্ট, দুইজন অটিজম ইন্সট্রাকটর, একজন স্পিচ থেরাপিস্ট, ডেভলপমেন্টাল থেরাপিস্টসহ মোট ১৭ জনসহ এই বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে থাকে। এদিকে, ইপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৃথক একটি ইন্সটিটিউট হিসেবে অনুমোদন পেয়েছে এবং এর ফলে ভবিষ্যতে ৫৬ জন শিশুকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যাবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত এখানে ২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।

একেকজন শিশু নিজের হাতে কিছু ধরতে পারত না, আর এখন সে চামুচ দিয়ে ভাত খাচ্ছে, প্রথম অবস্থায় দুই তিন জন ছাড়া কেউ কথাই বলত না, আর এখনো অন্তত ১৫ জন শিশু কথা বলছে, কবিতার লাইন বলছে— এটা যে আমাদের জন্য কত আনন্দের সেটা আমরা ছাড়া কেউ বুঝবে না বলছিলেন, সাঈদা আলী সোমা।

অটিজম ইন্সট্রাক্টর মমতাজ বেগম বলেন, ‘তবে গত বছরগুলোর তুলনায় বাবা-মায়েরা অনেক সচেতন হয়েছে এটা আশার কথা। ঢাকার বাইরে থেকেও ছোটছোট সন্তানদের নিয়ে আসছেন অভিভাবকরা।

সারাবাংলা/জেএ/আইজেকে