Thursday 14 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কাপড়ের সাম্রাজ্য ইসলামপুরে একদিন…


২৬ মে ২০১৮ ১৬:৩৪ | আপডেট: ৫ নভেম্বর ২০১৮ ১৯:৫৯
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

।। মাকসুদা আজীজ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর।।

ঢাকা: ঈদ আনন্দের দিন, তবে এই আনন্দ তৈরি হয় কয়েকটি অনুষঙ্গ নিয়ে। ভালো খাবার, ঈদের সালামি আর নতুন পোশাক। সেই পোশাক নিয়েও কতো জল্পনা-কল্পনা। সবার থেকে আলাদা হতে হবে, যেন ঈদের দিন সবার চোখ আটকে যায় আমার পোশাকেই! সেই পোশাকের জন্য আবার কতো আয়োজন, কাপড়-বোতাম-লেস কেনা, দর্জি বাড়ি যাওয়া। এইসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় শবে বরাতের পর থেকেই। তাই ঈদ আসার আগে আগেই দেশের সবচেয়ে বড় কাপড়ের বাজার ইসলামপুরেও শুরু হয় কাঁচি দিয়ে কাপড় কাটার কচ কচ শব্দ।

পুরো ইসলামপুর জুড়ে আছে কাপড়ের অনেকগুলো মার্কেট। নূর ম্যানশন, সাউথ প্লাজা, গুলশান আরা সিটি, মনসুর ক্যাসেল, ইসলাম প্লাজা, কে হাবিবুল্লাহ মার্কেট… আরও কত নাম! কোনোটাতে প্যান্টের কাপড় বিক্রি হয়, কোনোটাতে শার্টের, কোথাও পাওয়া যায় শুধুই বিছানার চাদর আর পর্দার কাপড়। চলতে চলতে দেখা মিলবে বোরখার মার্কেটেরও। ইসলামপুর রোড, আহসানউল্লাহ রোড আর নবাববাড়ি রোড সবগুলো পথই ভীষণ সরু আর ব্যস্ত। তারমধ্যেই চলতে থাকতে গাট্টি গাট্টি মাল নামানো-ওঠানোর কাজ। না আছে গাড়ি যাওয়ার পথ না হাঁটার। তাই ঠেলেঠুলেই চলতে হয় এই মার্কেটে।

বিজ্ঞাপন

পাইকারি গজ কাপড়ের মার্কেটগুলো প্রায় ফাঁকা, কেন? কারণ গজ কাপড় কিনে জামা বানাতে অনেক সময় লাগে। আর কারও যদি কাজ করানো লাগে তাহলে তো কথাই নেই, পাইকারি বাজার থেকে তাই আগেই সব কেনাকাটা সেরেছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। এখন সব ভিড় খুচরা ব্যবসায়ীদের বাজারে। কেউ কাপড়ের পর কাপড়ের থান দেখছেন, মনে মনে যে রঙ, না এটা ঠিক সেই জামা নয়! ওদিকে কেউ আবার কাপড়ের ছোট টুকরো নিয়ে রঙ মেলাচ্ছেন। ঠিক ঠিক পছন্দের রঙটা পেতে হবে তো।

রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থেকে এসেছেন ফারজানা, সঙ্গে তার ননদ চুমকি আর ছোট দু’টি মেয়ে। সবার পোশাকের পাশাপাশি একে-তাকে দেওয়ার জন্য ঈদের উপহারও কেনা হবে। বাচ্চা দু’টির হাতে মোবাইল আর তাতে স্বপ্নের জামার ছবি। এই কাপড়ের সঙ্গে মিল থাকতে হবে তাদের পোশাকেও। গুলশান আরা সিটি মার্কেটের দোকানি জুয়েল, একটুও বিরক্ত নন বাচ্চা মেয়ে দুটোর আবদারে। পোশাকের পর পোশাক নামাচ্ছেন দোকানে থাকা কিশোর ছেলেটাকে পাঠাচ্ছেন এই দোকান থেকে সেই দোকানে এই দুই রাজকন্যার স্বপ্ন পূরণ করতে।

দোকানের কিশোর ছেলেটার নাম জুম্মন। তার কাছে জানতে চাওয়া হলো, তার নিজের ঈদের পোশাক কেনা হয়েছে কিনা। দাঁত বের করে তার জবাব, ‘চাঁন রাইতের দিন মাহাজনে কিনা দিব।’ হাতের কাপড় সামলাতে সামলাতে তার জিজ্ঞাসা, ‘আপা কাপড় কিনসেন?’ হেসে সম্মতি জানাতেই ফের প্রশ্ন, ‘আপা আপনার কাপড় কী রঙে, আমাগো দোকান থিকা কিছু নিবেন না?’ জুম্মনরা শুধু এর-ওর জন্য কাপড় টানাটানি করে না, সন্ধ্যায় ইফতার বানানোর দায়িত্বও ওর ঘাড়ে। মহাজন বা দোকানের মালিক খুব আদর করে ওকে। এমনকি ক্রেতারাও খুশি হয়ে হাতে গুজে দেয় কিছু টাকা। খারাপ কাটে না ঈদের সময়টা।

গুলশান আরা সিটির পাশের মার্কেটটিই আনস্ট্রিচ থ্রি পিসের। জামায় ডিজাইন করা একদম তৈরি শুধু কিনে সেলাই করে নিলেই হবে। উপহার দেওয়ার জন্য এই মার্কেটটাই সবচেয়ে পছন্দ সবার। কারণ? কারণ এখান থেকে পোশাক দেরিতে নিয়ে গেলেও সেলাই করে দেয় দর্জিরা। জানালেন ঐ মার্কেটের একজন দোকানি। কথা বলার ফুরসতও নেই তাদের। জামা নিচে নামাতে দেরি বিক্রি হতে দেরি নেই।

তবে পুরুষদের কাপড়ের মার্কেটে ভিড় তুলনামূলক কম। দোকানিরা জানালেন, পুরুষদের বাজার জমে ইফতারের আগে, যখন বাড়ির নারীরা ইফতার বানাতে বসেন তারা আসেন বাজার করতে। ইফতারের পরে নারী-পুরুষ সবাই আসে বাজারে। এই বাজার চলে রাত দশটা পর্যন্ত।

যদিও ঈদে পোশাকের মার্কেটেই ক্রেতা বেশি তবু বিরান নয় বিছানার চাদর ও পর্দার বাজারও। পোশাকের সঙ্গে নতুন করে ঘর সাজানোর শখটাও মিটাতে চান অনেকেই। সেখানের একজন ক্রেতা বিলকিস আরা বলেন, ‘ঈদের সময় হাতে টাকা থাকে। তাই ঘরটাও একটু গুছিয়ে নিচ্ছি। তাছাড়া ঈদের সময় অনেক ধরনের কাপড় থাকে। বছরের অন্য সময়ে এত বৈচিত্র্য পাওয়া যায় না।’

কাপড়ের বাজারের সঙ্গেই আছে লেস আর বোতামের একটা মার্কেটও। তবে এখানে খুচরা বিক্রি নেই বললেই চলে। কিনতে হলে কিনতে হবে পাইকারি। যারা বুটিকের ব্যবসা করেন তাদের জন্য এই মার্কেটটা স্বর্গ। ফরমাইশ করলে বানিয়ে দেবে এমন দোকানও আছে। সেখানে পরিচয় হলো আফরিনের সঙ্গে। তিনি একজন অনলাইন বুটিকের মালিক। লাজুক মুখে বললেন, ‘ঠিক অনলাইন না, ফেসবুকে বুটিক।’ জানা গেলো আফরিন নিজেই ডিজাইন করে বানান পোশাক। সেই পোশাক কিনে নেয় ফেসবুকের ক্রেতারা। ‘কিছু একটা করতে চেষ্টা করছি’, আফরিনের মতো পাওয়া যায় আরও কয়েকজনকে। ঘরে বসেই করা যায় বলে এই বুটিকের ব্যবসাই তাদের জীবনে ‘কিছু একটা’ করা।

কাপড়ের দোকানের ফাঁকেই ফলের দোকান। এলাকাটা একসময় ছিলই আমপট্টি। ১৯৭৩ সালে পাকাপাকিভাবে কাপড়ের পাইকারি বাজার বসার পরে আমের বাজার সরে যায় অন্যদিকে। তবুও কিছু ফলের দোকানি এখনও বসে এখানে। তাদের প্রধান ক্রেতা মূলত কাপড় ব্যবসায়ীরাই। আছে খাওয়ার দোকানও। ইফতার এগিয়ে আসতে থাকে ইসলামপুরেও বাড়ে পুরুষ ক্রেতাদের আনাগোনা। নূর ম্যানশনের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বিক্রেতা বলেন, ‘ব্যবসা নবীর সুন্নত, মেহমান নিয়ে ইফতার করাও নবীর সুন্নত। আমরা সবাইকে নিয়ে খাই। রোজ দিনই এভাবে ইফতার হয়। এভাবেই আমরা কয়েক প্রজন্ম ধরে ইফতার করে আসছি।’

সারাবাংলা/এমএ/এমও