Tuesday 20 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গণভোট ২০২৬: একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারে জনগণের রায়

সানজিদা যুথী সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৩

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে একটি সাংবিধানিক গণভোট। এই গণভোটের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হবে— ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার কার্যকর করা হবে কি না।

এই লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন করেছে।

পটভূমি: আন্দোলন থেকে সংস্কারের পথে

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। সে সময় ক্ষমতা আকড়ে থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

বিজ্ঞাপন

এই সরকারের মূল অঙ্গীকার ছিল— একটি গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রণীত হয় জুলাই জাতীয় সনদ, যা সংবিধান পুনর্গঠনের একটি জাতীয় রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জুলাই জাতীয় সনদের মূল প্রস্তাবনা

জুলাই সনদে রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ— সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।

এই সংস্কারগুলো সরাসরি কার্যকর না করে জনগণের মতামতের জন্য গণভোটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

গণভোটে কী প্রশ্ন করা হবে?

গণভোটে ভোটারদের কাছে মূলত একটি প্রশ্নই থাকবে— জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে কি না।
ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’—এই দুই বিকল্পের একটিতে ভোট দেবেন।

‘হ্যাঁ’ ভোটে কী থাকছে?

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়লে সংবিধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যকর হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গঠনে সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা,

কোনো সরকার এককভাবে ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করতে না পারা,

সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক করা,

বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব প্রদান,

প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করতে না পারা,

সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব ধাপে ধাপে বৃদ্ধি,

ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন,

বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা,

মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ—যার মধ্যে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ না করার সাংবিধানিক সুরক্ষাও রয়েছে,

দুর্নীতিগ্রস্ত অপরাধীদের রাষ্ট্রপতির ইচ্ছাধীন ক্ষমা প্রদানে সীমাবদ্ধতা,

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে স্পষ্ট ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।

সমর্থকদের মতে, এসব সংস্কার কার্যকর হলে নির্বাহী ক্ষমতার লাগাম শক্ত হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়বে।

‘না’ ভোটে কী হবে?

গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে রায় এলে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত কোনো সংস্কার কার্যকর হবে না। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে।

অর্থাৎ— সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতেই থাকবে এবং প্রস্তাবিত নতুন ভারসাম্য কাঠামো বাস্তবায়িত হবে না।

কেন এই গণভোট গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই গণভোটের তাৎপর্য ব্যতিক্রমী। কারণ—

এই প্রথম সংবিধান সংস্কার নিয়ে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হচ্ছে,

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে,

এটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্তের সুযোগ দিচ্ছে নাগরিকদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গণভোট মূলত একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—
ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকবে, নাকি বণ্টিত হবে?

শেষ কথা হলো

২০২৬ সালের নির্বাচন শুধু কে সরকার গঠন করবে— সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একই সঙ্গে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে।

একটি ভোট— শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন নয়, বরং সংবিধান ও রাষ্ট্রের কাঠামো নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

দেশের চাবি কি সত্যিই জনগণের হাতে যাবে— নাকি আগের পথেই চলবে বাংলাদেশ? উত্তর দেবে ২০২৬ সালের গণভোট।

লেখক: সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, সারাবাংলা ডটনেট

সারাবাংলা/জিএস/এএসজি
বিজ্ঞাপন

পাবনায় ট্রাকচাপায় শিশু নিহত
২০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪০

আরো

সানজিদা যুথী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর