Thursday 07 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বিশ্বজুড়ে সার সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ

সাইফুল ইসলাম শান্ত
২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:১৫

বিশ্ব অর্থনীতি যখন একের পর এক সংকটের অভিঘাতে নড়বড়ে তখন কৃষি খাতে নীরবে জমতে থাকা আরেকটি বড় বিপদের নাম সার সংকট। এই সংকট প্রথমে হয়তো বাজারের দামের ওঠানামা হিসেবে দেখা দেয় কিন্তু এর প্রকৃত প্রভাব অনেক গভীরে। এটি সরাসরি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। কারণ আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় সার ছাড়া উচ্চ ফলন কল্পনা করা যায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং রপ্তানিকারক দেশগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে বৈশ্বিক সারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এর ফলে অনেক দেশেই কৃষকরা প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার পাচ্ছেন না কিংবা উচ্চমূল্যের কারণে ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল কারণ এখানে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষকের টিকে থাকা সারের প্রাপ্যতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

বিজ্ঞাপন

সার সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট। ইউরিয়া ও অন্যান্য রাসায়নিক সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস একটি প্রধান উপাদান। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশে সার উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এমনকি কিছু কারখানা উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। রাশিয়া ও বেলারুশ বিশ্বের অন্যতম বড় সার রপ্তানিকারক দেশ। এই দেশ দু’টির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তৃতীয়ত, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন। কোভিড-পরবর্তী সময়ে জাহাজ পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বন্দর জট এবং কাঁচামাল সংকট সারের বাজারকে আরও অস্থির করে তুলেছে।

এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। কৃষকরা যখন পর্যাপ্ত সার পান না, তখন জমিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এর ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়। ইতোমধ্যে দেখা গেছে অনেক দেশে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করছেন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজ নিজ বাস্তবতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে সফলতা দেখিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেশটি ‘গ্রিন রেভল্যুশন’-এর মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল বীজ, সেচ ব্যবস্থা এবং ভর্তুকিনির্ভর সার ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। পাশাপাশি সরকারি খাদ্য মজুদ ও পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভিয়েতনাম কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেছে। ১৯৮০–এর দশকের পর বাজারমুখী নীতি গ্রহণ, কৃষকদের জমির অধিকার প্রদান এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন বাড়ানোর ফলে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় চাল রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে। আফ্রিকায় ইথিওপিয়া খাদ্য নিরাপত্তায় অগ্রগতি দেখিয়েছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে। ‘প্রোডাক্টিভ সেফটি নেট প্রোগ্রাম’-এর আওতায় খাদ্য সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়ে দুর্ভিক্ষপ্রবণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে নেদারল্যান্ডস একটি অনন্য উদাহরণ। সীমিত জমি থাকা সত্ত্বেও আধুনিক প্রযুক্তি, গ্রীনহাউস চাষ এবং দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক হয়েছে। এই উদাহরণগুলো থেকে বোঝা যায়, সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা একত্রে প্রয়োগ করতে পারলে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব।

বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এই সংকট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের যে লক্ষ্য বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্জন করেছে তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে সারের যথাযথ ব্যবহারের ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ এখনো সারের ক্ষেত্রে পুরোপুরি স্বনির্ভর নয়। দেশে প্রধানত ইউরিয়া, টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট), ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) এবং এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) এই চার ধরনের সার ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ইউরিয়া সার আংশিকভাবে দেশে উৎপাদিত হলেও বাকি সারের বেশিরভাগই আমদানি নির্ভর। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে গ্যাস সংকট ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন প্রায়শই কম থাকে। অন্যদিকে টিএসপি ও ডিএপি সীমিত পরিসরে উৎপাদিত হলেও চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর এমওপি সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর। দেশে বছরে মোট সারের চাহিদা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টনের কাছাকাছি। এর একটি বড় অংশই আমদানি করে পূরণ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা সরাসরি দেশের কৃষি খাতে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যখন বৈদেশিক মুদ্রার চাপ থাকে তখন প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার আমদানি করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

সরকার দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকির মাধ্যমে কৃষকদের সারের দাম সহনীয় রাখার চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সেই ভর্তুকির পরিমাণও বেড়ে যায়, যা রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে একদিকে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা অন্যদিকে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কীভাবে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় এবং একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন ধরে রাখা যায়। এর জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা। গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে বিদ্যমান ইউরিয়া কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন সার কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা। অনেক সময় দেখা যায় কৃষকরা ইউরিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যার ফলে মাটির পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়। মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবহারের প্রচলন বাড়াতে হবে। এতে কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

তৃতীয়ত, বিকল্প সার ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। জৈব সার, কম্পোস্ট, সবুজ সার ইত্যাদির ব্যবহার বাড়ানো গেলে রাসায়নিক সারের ওপর চাপ কমানো যাবে। এতে মাটির স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বৈচিত্র্য করা। এক বা দুইটি দেশের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎস থেকে সার আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। এতে কোনো একটি উৎসে সমস্যা হলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হবে।

পঞ্চমত, কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। কম সার ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন সম্ভব—এমন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই সংকটকে কেবল একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। এই বাস্তবতায় কৃষি উৎপাদন ধরে রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। সেখানে সারের মতো একটি মৌলিক উপকরণের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। কিন্তু এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে সারের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, সারের সুষম ব্যবহার, বিকল্প পদ্ধতির প্রসার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৌশলগত অংশীদারিত্ব—এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। অন্যথায়, সার সংকটের প্রভাব ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট