Monday 11 May 2026
সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান
মুসলিমসহ সকল সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত জরুরি

গোলাম সামদানী, হেড অব নিউজ
১১ মে ২০২৬ ২১:০৪

ঢাকা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তৃণমূল কর্মীদের মারধর, দলটির অফিস দখলসহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় বুলডোজার নিয়ে বিজেপি কর্মীদের মিছিল ও একটি মাংসের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া, মসজিদে ঢুকে গান-বাজনা করে নামাজরত মুসল্লিদের অসম্মান করার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বিজেপির এই জয়ের মধ্যদিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও কি উত্তরপ্রদেশের বিজেপির বুলডোজার রাজনীতি চালু হতে যাচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী এই ধরনের সহিংস ঘটনা সে দেশের গণতান্ত্রিক মানুষের সঙ্গে আমাদেরকেও উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ এবং তাদের সঙ্গে আমাদের যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে তার বড় অংশই মূলত পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। ভারত কেবল আমাদের কেবল নিকট প্রতিবেশী নয়, বরং দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে দেশটির ভূমিকা ঐতিহাসিক। ভারতের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ বাণিজ্য রয়েছে। আবার অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনসহ দ্বি-পাক্ষিক বেশ কিছু ইস্যু রয়েছে।

এইসব কারণে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক রাজনৈতিক পরিবর্তনে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল বাংলাদেশের সচেতন নাগিকদের মধ্যে আগ্রহ, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা তৈরি করে। বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিকের মনে প্রথমেই এই প্রশ্ন আসে, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আমরা কি পাব? সীমান্তে হত্যা কি বন্ধ হবে? সকল নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশে সীমান্তে দেওয়া কাঁটাতারের বেড়া- এসব নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে অনেকদিন ধরেই।

এরই মধ্যে দিয়ে সম্পতি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনের ফলাফলে দেখা যায়, বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন, তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। এতে করে পশ্চিমবঙ্গে গত ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের চরম ভরাডুবি হয়েছে। আর অবিশ্বাস্য উত্থান হয়েছে বিজেপির। বিষয়টি যদি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বিজেপির জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর যে তাণ্ডব শুরু হয়েছে এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পাশাপাশি প্রধান বিরোধীদল তৃণমূল নেতাকর্মীদের অফিস, বাসাবাড়িতে যে হামলা করা হয়েছে, সেটাও গণতান্ত্রিক দেশে কাম্য নয়। তাই ভারত সরকারের উচিত পশ্চিমবঙ্গসহ সারা ভারতে মুসলিমসহ সকল সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতীয় মুসলমানদের যেভাবে বাংলাদেশে পুশইনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কারণ, ভারতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক নেই। ভারত এত উন্নত কিংবা ধনী দেশ নয় যে, সেখানে বাংলাদেশিরা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে যাবে। বরং, অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা ভারতের অনেক প্রদেশের চেয়েও উন্নত। ফলে নানা অজুহাতে পশ্চিমবাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা অপ্রত্যাশিত। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সকে (বিএসএফ) ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। নতুন মুখ্যমন্ত্রীর এই আচরণ দুই দেশের সম্পর্ক টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

১৯৯৯ সালে বিজেপি জোট যখন দিল্লিতে সরকার গঠন করে এবং অটল বিহারী বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হন, তখন মমতা বন্দোপাধ্যায় ওই সরকারের রেলমন্ত্রী হন। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন এবং একদশকের মতো সময় মমতা বন্দোপাধ্যায় বিজেপি জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ ছাড়া ৩৪ বছরের বামশাসন সরাতে ২০১১ সালে বিজেপির হাত ধরেছিলেন মমতা। তার দেড় দশক পরে মমতাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে বিজেপি। ভোটের হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাম কর্মীদের একটা বড় অংশ তৃণমূলকে হটাতে বিজেপিকে সমর্থন করেছে। রাজনীতিতে পরিবর্তন যে অনিবার্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি সেটা আবার মনে করিয়ে দেয়।

বিজেপির উগ্রহিন্দুত্ববাদ বা দলটির নেতাদের উগ্র কথাবার্তা গণতান্ত্রিক মানুষদের ভাবিয়ে তোলে। এটি সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটা উদ্বেগের বিষয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু তৃণমূল সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে যতটা ব্যবহার করেছে, তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করেছে- এই প্রসঙ্গও উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গে মমতার ১৫ বছরের শাসমালে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়নি। শিক্ষিত যুবকদের একটা বড় অংশ বেকার। রাজ্য থেকে প্রতিবছর বিশাল অংকের যুবক কর্মসংস্থানের জন্য অন্য রাজ্যগুলোতে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর সঙ্গে আছে মূল্যস্ফীতি। এই দুটো বিষয় নাগরিকদের নাভিশ্বাস তুলেছে। এর সঙ্গে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের অভাব। মানুষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সামজিক সম্মানও চায়। তৃণমূল শাসনের সময় সেগুলোর ঘাটতি জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারীর নিরাপত্তার ইস্যু ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ।

বিজেপি এই ইস্যুগুলোকে ভোটের মাঠে ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছে। বিশেষ করে দুর্নীতির বিষয়ে তারা ভোটের প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যার বিরুদ্ধে তৃণমূল কোনো যৌক্তিত বক্তব্য দিতে পারেনি। এ সব কারণে জনগণ বিজেপিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। কিন্তু, সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো- বিজেপি ২০৭টি আসনের মধ্যে একজনও মুসলিম সম্প্রদায়ের নেই। থাকার কোনো সুযোগও ছিল না। কারণ, বিজেপি থেকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। যা দলটির মুসলিম বিদ্বেষী আচরণের প্রতিফলন দৃশ্যমান করেছে। শুধু তাই নয়, নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন থেকে লাখ লাখ মুসলিম সংখ্যালঘু ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, মুসলিম অধ্যুষিত আসনগুলো কাটছাট করে অন্য আসনের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর এই কারণে পরাজয়ের পর তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি যতটা অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে, তার চেয়ে বেশি অভিযোগ করেছেন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে তিনি ১০০ আসনে পূননির্বাচন দাবি করেছেন।

অর্থনীতিবিদ এডামস্মিথ মনে করতেন, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক জরুরি। বাংলাদেশ বরাবরই প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ভারত আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশি দেশ। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে নানা বিষয়ে দেশটিকে আধিপত্য বিস্তারে যে সুযোগ করে দিয়েছে এবং নানা ইস্যুতে দেশটির আধিপত্যবাদী আচরণ দেশের জনগণ স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। এই কারণে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ভারতের বিরুদ্ধেও জনমনে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়। ’২৪ এর জুলাইয়ে শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে চলে যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই দেশের যৌক্তিক সম্পর্ক আবারও স্থাপিত হয়েছে। এতে উভয় দেশই লাভবান হবে আশা করা যায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উথান এবং নির্বাচন পরবর্তী দলটির বাংলাদেশ বিদ্বেষী আচরণ, দুই দেশের শান্তিকামী জনগণকে হতাশ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো হচ্ছে, সীমান্ত হত্যা, পুশইন বা পুশ আউট এবং সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার বিষয়। বিজেপি ক্ষমতায় এলে মুসলিমরা অনিরাপদ হয়ে পড়বে এমন একটা প্রচার আছে। সেটা যেন বাস্তবে না হয়। আমরা চাই সেখানকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। যে কোন রাজনৈতিক পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি হচ্ছে জনগণ। সেখানকার জনগণ পরিবর্তন চেয়েছে, আমরা তাদের অবস্থনকে সমর্থন জানাই। কেননা জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস- আমরা এই নীতিতে বিশ্বাসী। পাশাপাশি বিশ্বের সকল দেশে সকল ধর্ম, বর্ণের মানুষ নিরাপদে বসবাস করুক- এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর