Sunday 25 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বন্যা না হওয়ায় লাউয়ের বাম্পার ফলন, মিলছে ভালো দামও

আশরাফুল ইসলাম জয়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪৯ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৪১

সিরাজগঞ্জে লাউয়ের বাম্পার ফলন। ছবি: সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জ: যমুনার পললবিধৌত কৃষিনির্ভর জেলা সিরাজগঞ্জ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে যমুনা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যায় জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলের মাঠ তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকেরা। তবে এ বছর এখন পর্যন্ত বড় ধরণের বন্যা না হওয়ায় কৃষিতে দেখা দিয়েছে স্বস্তি। অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো পরিচর্যার সুযোগ পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে সবজির আবাদ। এর মধ্যে লাউয়ের বাম্পার ফলনে হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় এই সবজি চাষে আগ্রহও বাড়ছে কৃষকদের।

জেলার সদর, কামারখন্দ, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুরসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন লাউয়ের সমারোহ। কোথাও বাঁশের মাচায় ঝুলছে সারি সারি লাউ, আবার কোথাও জমি থেকে সদ্য তোলা লাউ নিয়ে বাজারের উদ্দেশে ছুটছেন কৃষকেরা। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত জমি থেকে লাউ সংগ্রহ, বাছাই ও বিপণনে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন কৃষক ও ব্যবসায়ী জমি থেকে লাউ সংগ্রহ করে হাট-বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। পাইকারদের মাধ্যমে এসব লাউ জেলার বিভিন্ন বাজার ছাড়াও আশপাশের জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাজারে সবজির সরবরাহ যেমন বাড়ছে, তেমনি কৃষকেরাও উৎপাদিত পণ্যের দ্রুত বিপণনের সুযোগ পাচ্ছেন।

কৃষকরা জানান, লাউ তুলনামূলক কম সময়ে বিপণন করা যায় এবং চাহিদাও থাকে বছরজুড়ে। ফলে অন্য অনেক সবজির তুলনায় লাউ চাষে ঝুঁকি কম। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আশানুরূপ ফলন হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে ভালো দাম থাকায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে সন্তোষজনক লাভের আশা করছেন তারা।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ১১৮ হেক্টর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়েছে। উচ্চফলনশীল ও লাভজনক সবজি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে কৃষকদের লাউ চাষে উৎসাহিত করছে কৃষি বিভাগ। এ ছাড়া সবজি উৎপাদন বাড়াতে জেলার আট হাজার কৃষককে কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।

কামারখন্দ উপজেলার চর নুরনগর এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবার ৬০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছেন। সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে তিনি বলেন, ‘লাউ চাষের জন্য এবার আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল। বন্যার পানি না ওঠায় জমিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। নিয়মিত পরিচর্যা করতে পেরেছি। ফলে গাছে প্রচুর লাউ ধরেছে। বাজারে দামও ভালো থাকায় আশা করছি, খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে বন্যার কারণে অনেক সময় ফসল ঘরে তোলার আগেই নষ্ট হয়ে যেত। এ বছর সেই সমস্যা হয়নি। লাউ চাষে ভালো ফলন ও দাম পাওয়া গেলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক আসাদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘লাউ চাষে খরচ আছে, তবে ফলন ভালো হলে সেই খরচ সহজেই উঠে আসে। এ বছর লাউয়ের ফলন বেশি। বাজারে চাহিদা থাকায় লাউ বিক্রি করে ভালো টাকা পাওয়া যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বন্যা না হওয়াটা এ বছর আমাদের জন্য আশীর্বাদ। জমিতে পানি উঠে গেলে লাউগাছ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এবার সে ধরনের পরিস্থিতি হয়নি। তাই সময়মতো সার, কীটনাশক ও পানি দিতে পেরেছি। এতে ফলনও ভালো হয়েছে।’

সিরাজগঞ্জে লাউয়ের বাম্পার ফলন। ছবি: সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জে লাউয়ের বাম্পার ফলন। ছবি: সারাবাংলা

উল্লাপাড়া উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘লাউ এখন আমাদের এলাকার অন্যতম লাভজনক সবজি। লাউয়ের চাহিদা সবসময় থাকে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন হাটে নিয়েও বিক্রি করা যায়। এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় এবং দাম মোটামুটি ভালো থাকায় আমরা লাভের আশা করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় জমিতে এসে পরামর্শ দেন। কোন সময়ে কী সার দিতে হবে, রোগবালাই হলে কী করতে হবে- এসব বিষয়ে পরামর্শ পাওয়ায় আমাদের অনেক সুবিধা হয়।’ কৃষি বিভাগ থেকে প্রণোদনা ও আধুনিক চাষাবাদের সহযোগিতা আরও বাড়ানো হলে লাউসহ বিভিন্ন সবজির উৎপাদন আরও বাড়বে বলে জানান তিনি।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাউ চাষে তুলনামূলক কম সময়ে ফলন পাওয়া যায়। সঠিক জাত নির্বাচন, উন্নত বীজ ব্যবহার, সময়মতো সার ও সেচ প্রয়োগ এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া মাচা পদ্ধতিতে চাষ করায় একই জমিতে গাছের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

লাউ চাষে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। বিশেষ করে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে লাউ চাষ করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা, আগাছা নিয়ন্ত্রণ এবং রোগবালাইয়ের প্রকোপ কমানোসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যায়। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি ফলনও বাড়তে পারে।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক এ. কে. এম. মনজুরে মাওলা সারাবাংলাকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় লাউয়ের আবাদ বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে লাউ চাষের জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মালচিংসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ফলন বাড়ানোর পাশাপাশি রোগবালাই ও আগাছা নিয়ন্ত্রণে সুবিধা পাওয়া যায়।’

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সিরাজগঞ্জে সবজি উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। জেলার নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় উর্বর পলিমাটিতে নানা ধরনের সবজি উৎপাদন করা হয়। তবে বন্যা ও নদীভাঙন কৃষির জন্য বড় ঝুঁকি। বন্যার পানি দ্রুত মাঠে প্রবেশ করলে লাউসহ বিভিন্ন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ কারণে বন্যা না হওয়ায় চলতি মৌসুমে লাউ চাষিরা তুলনামূলক স্বস্তিতে রয়েছেন।

প্রতিবছর বন্যার সঙ্গে লড়াই করে কৃষিকাজ করতে হয় যমুনাপাড়ের কৃষকদের। তবে চলতি মৌসুমে বড় ধরণের বন্যা না হওয়ায় সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো পরিচর্যা এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় লাউ চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত দেখছেন সিরাজগঞ্জের কৃষকরা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর