ঢাকা: পুলিশ সপ্তাহে ‘বিপিএম’ ও ‘পিপিএম’ পদক প্রদানের ঘোষণা দিয়ে ১০৭ কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করার পরও মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তা স্থগিত করা হয়েছে। এ নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষ্যে একটি আহ্বায়ক কমিটি করা হলেও সেটিকে মূল্যায়ন না করার অভিযোগ, তালিকায় ‘ফ্যাসিস্ট’ আমলে পদক পাওয়া কর্মকর্তাদের নাম ঢুকে যাওয়া, পুলিশ সপ্তাহের ক্রোড়পত্রসহ নানা ইস্যুতে অসন্তোষ এবং সারাদেশে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও খুন বেড়ে যাওয়ায় নজিরবিহীন অস্থিরতায় রয়েছে পুলিশ।
রোববার (৯ মে) রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে আয়োজিত পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠান চলাকালে একাধিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
এদিন পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, আনন্দমুখর পুলিশ সপ্তাহে সবাই যেন নিরানন্দে সময় কাটাচ্ছেন। বেশিরভাগেরই একটাই অভিযোগ, ইতিহাসে যা ঘটেনি তা ঘটেছে পুলিশে। এই প্রথম মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ‘পুলিশ পদক’ স্থগিত করা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের কর্মকর্তারা এই মুহূর্তে অন্তত সাতটি ভাগে বিভক্ত বলে জানা গেছে। ফলে ঘটছে নানান ঘটনা। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নিয়ে একটা পেশাদারবাহিনী চলতে পারে না। দিনের পর দিন পুলিশ বাহিনীতে সংকট দেখা দিচ্ছে।
পুলিশ পদক প্রদান স্থগিত
পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনের আগের রাতে হঠাৎ করেই পদক বিতরণ স্থগিত করা হয়। পদকের জন্য মনোনীত তালিকাপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে, আগামীকাল পদক বিতরণ অনুষ্ঠান হবে না। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রাতভর কিছু বলা না হলেও পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, পদক পাওয়াদের বিষয়ে জিও না হওয়ায় এটি স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
জানা যায়, ১০৭ জন কর্মকর্তাকে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়। যেখানে আওয়ামী সরকারের আমলের পদক পাওয়াদের মধ্য থেকে ফের ১১ জন পদকের জন্য মনোনীত হন। অন্যদিকে অনেক বঞ্চিত কর্মকর্তার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তালিকায় নাম আসেনি। এ নিয়ে পুলিশে চলছে অভিযোগ-পালটা অভিযোগ। সেজন্য পদক প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
ক্রোড়পত্র বিতরণ নিয়ে ঝামেলা
রাজারবাগে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলেন, ফ্যাসিস্ট আমলে পুলিশ কর্মকর্তারা যা করেনি, তা গত দুই মাসে ঘটে গেছে। পুলিশবাহিনী এমনিতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। এর মধ্যে বাহিনীতে নানান ঝামেলা লেগেই আছে। ক্রোড়পত্র বিতরণ নিয়ে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। সেই কমিটির প্রধান করা হয় একজন ডিআইজিকে। অথচ ডিআইজি জানেনই না যে, কোন কোন গণমাধ্যমে ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তার প্রস্তাব ছিল প্রথম সারির সব গণমাধ্যমে ক্রোড়পত্র দেওয়া হোক। অথচ তাকে না জানিয়েই ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মাত্র পাঁচটি পত্রিকাকে ক্রোড়পত্র দিয়েছেন। এ নিয়ে ব্যাপক ঝামেলা হয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
পদক না দেওয়ায় মাঠ পর্যায়ে প্রভাব পড়বে
পুলিশ সদস্যদের পদক না দেওয়ায় মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। কারণ, যার পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন, তারা সাত দিন আগে থেকে এসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে রোদে পুড়ে পদক গ্রহণ প্যারেড করেছেন। এ ছাড়া পদক তালিকায় নাম থাকাদের অনেকেই পরিবারের সদস্যদেরও ঢাকায় এনেছেন। সেই পদক না দেওয়ায় সবাই মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগছেন। এতে প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এমনিতেই মাঠ পর্যায়ে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই বেড়ে গেছে। এখন সামনে কেমন দিন আসছে তা বলা যাচ্ছে না। এ ছাড়া কোথাও কোথাও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মাঠ পর্যায়ে উদ্বিগ্নতাও বেড়েছে বলে জানান অনেক পুলিশ কর্মকর্তা।
এদিকে রোববার (১০ মে) রাতে পুলিশ সদর দফতর থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক বিতরণ স্থগিতসংক্রান্ত নিউজটি একজন পুলিশ কর্মকর্তার বরাতে হয়েছে, তা সঠিক নয়। মুলত পদক প্রদানের কাজ চলমান রয়েছে। এআইজি মিডিয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করেছেন, ‘প্রকৃত বিষয় যাচাই-বাছাই না করে নিউজ প্রকাশ করা মোটেই কাম্য নয়।’ এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য আহবান জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
দাবি পূরণের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
১০ মে ছিল পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এদিন প্যারেড অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী আগত পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে কল্যাণ ক্যাম্পে বসেন। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি ও প্যারেড অনুষ্ঠানের আহবায়ক উপস্থিত ছিলেন। কল্যাণ ক্যাম্প অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। এর পর প্রধানমন্ত্রী সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। পুলিশের বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগে মেধা–যোগ্যতা–দক্ষতা–সততাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, পুলিশ সদস্যদের আবাসনসংকট সমাধান, চিকিৎসাসেবা, রেশন ও ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্নীতি, দুঃশাসন, দুর্বল শাসনকাঠামো, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এর মধ্যেই বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে সব প্রত্যাশা অল্প সময়ে পূরণ সম্ভব না হলেও সরকার ধাপে ধাপে সব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে।’ বক্তব্যের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অস্ত্রের শক্তির চেয়ে মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাই বড় শক্তি। একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়াই সরকারের লক্ষ্য।’ পুলিশ সদস্যদের পৃথক বেতন স্কেল সংক্রান্ত বিষয়ে দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিষয়গুলো ভবিষ্যতে শৃঙ্খলার সঙ্গে দেখা হবে।’