রংপুর: আট দফা যেকোনো সময় জাতির প্রয়োজনে একদফায় পরিণত হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, আজ সারা বাংলা থেকে আওয়াজ, আর সহ্য হয় না। আপনারা একটা কিছু করেন। সেই একটা কিছু আমরা চাই। হওয়ার আগে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যদি না হয়, বসে বসে আঙুল চুষব না।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন আমরা জনগণের ছয়টি দাবি নিয়ে প্রথমে নেমেছিলাম এবং সেই দাবির প্রেক্ষিতে আমরা চট্টগ্রামে প্রথম লং মার্চটি করেছিলাম। দ্বিতীয় লং মার্চ আসার আগেই আরো দুটি দাবি যুক্ত হয়েছে। এই মিলে আমরা আটটি দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। আমার বিশ্বাস আমাদের দাবিগুলো আপনাদের সবার জানা হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম একটা দাবিও আমাদের দলীয় দাবি নয়। এই দাবিগুলো ১৮ কোটি মানুষের দাবি। ১৮ কোটি মানুষের অধিকারের জন্য আমরা রাস্তায় নেমেছি।’
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচারসহ আট দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে এসব বলেন তিনি।
‘সরকার কথা দিয়ে কথা রাখেনি, গণভোটের রায় অগ্রাহ্য করেছে’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকার জনগণের সাথে কথা দিয়ে কথা রাখে নাই। নির্বাচিত হওয়ার আগেই রংপুর থেকেই তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে গণভোটে হ্যাঁ বলুন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই কথাটি এখানেই বলেছিলেন। জনগণ ৭০ ভাগ গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে। আমরা আগাগোড়া বলেছিলাম, উনি অন্তত একবার বলেছিলেন—একবার আর ১০ বার দিয়ে কোনো কথা নয়। জাতীয় নেতার মুখ থেকে জনগণের জন্য যে আহ্বান আসবে, জাতির প্রতি এটি হচ্ছে তার অঙ্গীকার। তিনি কি তার অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন? তিনি গণভোটের রায় মানেন নাই, তিনি অগ্রাহ্য করেছেন। অবশ্য সাহস করে তারা বলতে পারে না যে আমরা গণভোট মানব না। ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে যে সংবিধানে গণভোট নাই। সংবিধানে যদি গণভোট না থাকে, তাহলে কোন সংবিধান মেনে ২৪-এর গণবিপ্লব হয় নাই। ফ্যাসিস্টদেরকে আপনারা সংবিধান অনুসরণ করে তাড়াতে পারেন নাই, আমরা পারি নাই। সংবিধানের বাইরে গিয়েই ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশ গড়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যদি সংবিধানে কোনো ভোট না থাকে, ২৬ সালে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনও নাই, কোনো সরকারও নাই। সুতরাং মানতে হলে সবটা মানতে হবে। আর বাদ দিলে সবটা বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিন। তখন দেখা যাবে কার বুকের পাটা কতটুকু।’
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে সরকার
জামায়াত আমির বলেন, ‘একজন মন্ত্রী নির্বাচনের আগে জাগো বাহে, কুনঠে তিস্তা বাঁচায়—এই আওয়াজ তিনি দিয়েছিলেন। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী পরিষ্কারভাবে বললেন, যে নামেই হোক তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। সাত মাস চলে গেল, নড়াচড়া যে কিছু বুঝি না। কোনো দিক থেকে কোনো পানি পড়া খাইলেন? এখন যে আর আপনাদের কণ্ঠে অত জোর দেখি না। জনগণকে বারবার ধোকা দেওয়া ঠিক হবে না। আমরা নির্বাচনের আগে এই মাঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, আল্লাহ যদি আমাদেরকে নির্বাচিত করে সরকার গঠনের সুযোগ দেন, আমরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। আমরা বলেছিলাম গোটা উত্তরবঙ্গকে আমরা কৃষির রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলব, নদীগুলার জীবন আমরা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।’
একই পথে হাঁটলে পরিণতিও একই হবে
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবকিছু সহ্য করে দেশের স্বার্থে এই নির্বাচনের অনিয়মিত ফলাফল আমরা মেনে নিয়েছিলাম। দেশটা শান্তির দিকে আসুক। আর উনারা তো দফায় দফায় জাতির কাছে ওয়াদা দিয়েছে। কিন্তু আজগুবি আশ্চর্য ব্যাপার, সংসদে গিয়ে এখন সব ভুলে গেছে সরকার গঠন করার পরে। একটা একটা করে সবকিছু তারা উলটা রথে উলটা পথে চলছেন। যেই পথে হাসিনা চলে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, আমরা স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি সেই পথেই সেই পথ ধরেই বর্তমান সরকার হাঁটছে। যদি একই পথে হাঁটেন তাহলে পরিণতি একই হবে।’
বিদ্যুৎ-গ্যাস-সার নেই, চাঁদাবাজিতে জাতি অস্থির
তিনি বলেন, ‘আট দফা আমরা দিয়েছি জনগণের দফা। রংপুরের মানুষ ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পায় না, গ্যাস পায় পায় না। কৃষকরা সার পায় পায় না। আপনাদের সন্তানেরা হাতে পায় না। তবে একদলের লোকেরা কাজ পায়। সেই কাজ হলো চাঁদাবাজি। রংপুরে চাঁদাবাজি আছে। সারা বাংলাদেশে আছে। চাঁদাবাজদের জ্বালায় জাতি অস্থির। চাঁদাবাজদের কারণে দ্রব্যমূল্য তিন গুণ চার গুণ। চাঁদাবাজদের কারণে মানুষের জীবনও চলে যাচ্ছে।’
সিরাজগঞ্জে হামলার অভিযোগ
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে আজকে আমরা জনসভা পথসভা শেষ করে চলে এসেছি। চার-পাঁচ জন লোক তারা মসজিদে গেছে জোহরের নামাজ আদায় করতে। নামাজ পড়ে বের হয়েছে, গুন্ডারা তাদের ঘিরে একজনকে এমনভাবে কুপিয়েছে যে এখন তিনি মুমূর্ষু। আমরা স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, আর যদি এই ধরনের সন্ত্রাস করা হয়, তাহলে ১৮ কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে।’
আবু সাঈদ আমাদের বুকের সন্তান, তার জন্য সারা দুনিয়া কেঁদেছে
জামায়াত আমির বলেন, ‘রংপুরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করি আপনাদের বুকের সন্তান আবু সাঈদ, ২৪-এর আন্দোলনের আইকন। সারা দুনিয়া তার জন্য কেঁদেছে। আর সারা দুনিয়ার বিপ্লবীরা তাকে নিয়ে গর্ব করে। সেই মাটির মানুষ আপনারা। আমরা আপনাদেরকে যে কথা দিয়েছি, আমাদের কথার উপরে আমরা আছি। সরকার জাতিকে প্রতারণা করলে আমরা জাতির সাথে প্রতারণা করতে পারব না।’
লংমার্চের প্রয়োজন নাই, যদি সরকার ওয়াদা রাখে
তিনি বলেন, ‘আমাদেরকে জিজ্ঞেস করে, কেন লং মার্চ করো? তোমরা জাতির সাথে দফায় দফায় ওয়াদা ভঙ্গ করেছ, বলেই আমরা লং মার্চ করি। তোমরা ওয়াদা রাখো, আজকে ঘোষণা করে দাও—আমরা যা করেছি ভুল করেছি, এখন সব সংশোধন করে নেব এবং দৃশ্যমান বাস্তবায়ন তোমরা আমাদের দেখাও। আমাদের লং মার্চের প্রয়োজন নাই। কিন্তু যদি না হয়, মনে রাখবা লং মার্চ শুরু হবে। না তারপরে যে কি হবে আল্লাহ ভালো জানে। আমরা সমস্ত অপশক্তি, অন্যায় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে। আমরা বিশ্রাম নেব না। আমরা নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের অধিকার আদায় করতে। সেই অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরব।’
‘সংসদে প্রতিবাদ, রাজপথেও আন্দোলন’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সংসদের ভেতরে তীব্র প্রতিবাদ হবে। সমান্তরাল রাজপথেও আন্দোলন চলবে এবং সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জনতার দাবি আমরা আদায় করব। এই দাবি ১৮ কোটি মানুষের দাবি। আজকে রাস্তায় রাস্তায় আমাদের হাজার হাজার মা-বোনেরাও রাস্তায় নেমে আমাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন, সংহতি এবং একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। যে আন্দোলনে মায়েরা নেমেছেন, এ আন্দোলন সফল হবে। আমরা যে কথা দিয়েছি জাতিকে, আমরা যেন বেইমান না হই, আমরা যেন জাতির সাথে প্রতারণা না করি, বিশ্বাসঘাতকতা না করি। আমাদের জন্য আপনারা দোয়া করবেন। জীবন যাবে, জুলাই দেব না। জুলাই বাস্তবায়ন হবে। আপনাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ হবে। চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ হবে। আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ হবে।’
এর আগে শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে লংমার্চটি যাত্রা শুরু করে। লংমার্চের পথে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী সমাবেশকে ঘিরে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ৮০টি এবং মাঠের বাইরে বিভিন্ন সড়কে ১২০টি— মোট দুইশো মাইক টাঙানো হয়। আয়োজকদের দাবি, এবারের সমাবেশে রংপুর বিভাগের আট জেলা থেকে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে।
১১ দলীয় ঐক্যের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং অবিলম্বে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।