Saturday 26 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ডিজেলের দামবৃদ্ধিতে রংপুরের কৃষিতে ভয়াবহ খরচের চাপ

রাব্বী হাসান সবুজ
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৪১ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৫০

ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ার ধাক্কা সরাসরি গিয়ে পড়েছে রংপুর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে। এই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক কৃষক এখনো ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের উপর নির্ভরশীল। ফলে জমি তৈরি থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, কেবল বোরো ধানের জমি তৈরি ও সেচ কাজেই কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ১৩০ কোটি টাকারও বেশি। এই বাড়তি খরচ বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা না গেলে উৎপাদনই হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বোরো চাষে ডিজেল-নির্ভরতায় বাড়তি চাপ

রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা- রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় চলতি মৌসুমে ৫ লাখ ৯ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এসব জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে মোট ১ লাখ ৯১ হাজার ২৮৬টি নলকূপ। এর মধ্যে ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ ৯৬ হাজার ৪১৯টি এবং এলএলপি ৬৬৬টি, যেগুলো দিয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৫৬ হেক্টর জমি।

বিজ্ঞাপন

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক একর জমিতে ১৫ থেকে ২০ বার সেচ দিতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় ৫০ থেকে ৬০ লিটার ডিজেল। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এই খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

আগে যেখানে বোরো ধানের জমি তৈরিতে খরচ হতো প্রায় ৮২১ কোটি টাকা, এখন সেখানে খরচ হবে ৮৯৭ কোটি টাকা। আর সেচে আগে যেখানে খরচ হতো প্রায় ২৮৭ কোটি টাকা, এখন সেখানে খরচ হবে ৩৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই দুই খাতে কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ১২৭ কোটি টাকা। একইভাবে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে অন্যান্য ফসলেও।

রংপুর নগরীর খাসবাগ এলাকার আমনচাষি আসাদুজ্জামান আফজাল জানান, ২৪ শতক জমিতে প্রতি ঘণ্টা সেচ দিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকা। এ পর্যন্ত চারবার সেচ দিতে হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি একরে বাড়তি খরচ হচ্ছে প্রায় ৮ হাজার টাকা।

রংপুর সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘২০০ টাকার তেল আনতে যাতায়াতে খরচ হয়েছে ১২০ টাকা। এই তেলে চার ঘণ্টাও মেশিন চলবে না।’

ভুক্তভোগী কৃষকদের একজন বলেন, ‘তেলের দাম বাড়তি লিটারে ২০ টাকা বাড়াইছে। আমার কৃষকের সমস্যা। খরচ তো আমি মনে করি যে অনেক বেশি হবে আগের থেকে। আগে যদি ২০০০ টাকা খরচ হইতো সেখানে ৩০০০ টাকা লাগবে।’

যা বলছে কৃষি বিভাগ

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. এস এম আবু বক্কর সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমনের পরে ভুট্টা করতেছে, বোরোর পরে আমন করতেছে—মাঝখানে কিন্তু একটা টাইম দেড় দুই তিন মাস পর্যন্ত থাকে। এই সময় আমরা বলতেছি ধনচা করেন। ধনচা করে পারলিং করে সবুজ সার মাটির সাথে মিশায় দেন। মাটির সাথে যখন মিশাবে একটা স্তর তৈরি হবে, তখন কিন্তু আর আপনার ইরিগেশন লাগে না। অনেক কম লাগে।’

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সঠিক পদ্ধতিতে সেচ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে পানির অপচয় কমার পাশাপাশি হাজার হাজার টন ডিজেলও সাশ্রয় সম্ভব। প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে সাধারণত ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক কৃষক সঠিক ধারণা না থাকায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার লিটার পর্যন্ত পানি ব্যবহার করছেন।

সৌরশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ

কৃষি উৎপাদনের ডিজেলের উপর নির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, ‘সরকার এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো যদি কৃষিভিত্তিক সোলারের উপরে বিনা সুদে অথবা স্বল্পমূল্য সুদে যদি কৃষি ঋণ দেয় তাহলে দেখা যায় তারা এটার প্রতি আরো বেশি উদ্বুদ্ধ হবে।’

রংপুর অঞ্চলে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা এরইমধ্যে আশার আলো দেখাতে শুরু করেছে। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫.৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে একেকটি সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রামের কৃষক সুধাম চন্দ্র সেন বলেন, ‘তেলের চিন্তা নাই। সোলার থেকে বিদ্যুৎ হয়, পানি পাই। ফসলও ভালো হয়, খরচও কম লাগে।’

ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে বাজার ব্যবস্থাপনার দাবি

কৃষকরা বলছে, কৃষকদের বাড়তি খরচ যদি বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা না যায়, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদনে। ফলে সরকারকে এখন গুরুত্ব দিতে হবে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় বোরোর বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ধানের দাম কম থাকায় হতাশ কৃষকরা। নিজপাড়া গ্রামের কৃষক প্রহলাদ চন্দ্র জানান, সেচ, সার ও ওষুধের খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ১২০০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম মাত্র ৮৫০ টাকা।

ডিজেলের চাহিদা

রংপুর বিভাগে শুধু কৃষি খাতেই বছরে ১২ কোটি লিটারের বেশি ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এই বিশাল চাহিদার একটি বড় অংশ আমন ও বোরো মৌসুমে সেচ কাজে ব্যবহৃত হয়। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু সেচেই নয়, পড়ছে কৃষি যন্ত্রপাতি চালানোয়ও। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। সামগ্রিক হিসাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রতি বিঘা জমিতে একজন কৃষকের অন্তত ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ রায়ান আহমেদ রাজু বলেন, ‘সরকার যদি কৃষকদের জন্য বিশেষ জ্বালানি কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি ভর্তুকি বা নির্দিষ্ট দামে ডিজেল নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে প্রান্তিক কৃষকদের উপর এই বাড়তি খরচের ভার আরও ভারী হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর