Thursday 08 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন চিত্রনায়ক মান্না

এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক
৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:৫৯

ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিত্রনায়ক মান্না এক অবিস্মরণীয় ও সাহসী নাম, যিনি কেবল রূপালী পর্দার একচ্ছত্র অধিপতিই ছিলেন না, বরং নব্বই দশকের শেষভাগ ও দুই হাজারের দশকের শুরুতে চলচ্চিত্রে ছড়িয়ে পড়া অশ্লীলতার বিরুদ্ধে একাই এক দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।

একবার ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া তার অভিনীত ‘ফায়ার’ সিনেমায় অশ্লীল দৃশ্য থাকার অভিযোগ উঠলে সে সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল এই জনপ্রিয় অভিনেতাকে।

সিনেমাটি মুক্তির দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর সম্প্রতি মান্নার একটি পুরোনো ভিডিও সামনে এসে সেই বিতর্ক ও অজানা সত্যকে নতুন করে প্রকাশ্যে এনেছে, যা একই সঙ্গে উন্মোচন করেছে সে সময় চলচ্চিত্র শিল্পের ভেতরের কদর্য রূপ এবং এক প্রতিবাদী শিল্পীর চরম নিসঙ্গতার গল্প।

বিজ্ঞাপন

মান্নার নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কৃতাঞ্জলি সূত্রে পাওয়া ওই ভিডিওটিতে প্রয়াত এই মহানায়ককে অত্যন্ত জোরালো ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে দেখা যায়। মান্না জানান, ‘ফায়ার’ সিনেমায় অর্ধেকের মতো কাজ করার পরই তিনি এর ভয়াবহ রূপ বুঝতে পারেন এবং সঙ্গে সঙ্গে কাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেন। এমনকি সিনেমাটির ডাবিংয়েও তিনি কোনো অংশ নেননি। ভিডিওতে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি স্পষ্ট বলেন, একটি সিনেমায় সহশিল্পী, পরিচালক বা প্রযোজক কী করছেন, তা একজন অভিনেতার পক্ষে সবসময় পাহারা দেওয়া বা যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে নিজের অভিনয়ের শতভাগ সততা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মান্না দাবি করেন, তিনি নিজে কখনো কোনো অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয় করেননি।

চিত্রনায়ক মান্নার স্ত্রী শেলী মান্না গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পুরো ঘটনার পেছনের অন্ধকার সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, ‘ফায়ার’ সিনেমাটি মুক্তির পর অশ্লীল দৃশ্যের কারণে যখন দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়, তখনই এর নেপথ্যের ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মান্না সিনেমাটির কাজ অসমাপ্ত রেখে সরে দাঁড়ানোর পর তার অজান্তেই বিকল্প উপায়ে বডি ডামি ব্যবহার করে বেশ কিছু সংবেদনশীল ও বিতর্কিত দৃশ্যের শুটিং করা হয়েছিল। শেলী মান্নার ভাষ্যমতে, মান্না সময়মতো বুঝতে পেরেছিলেন যে তার অজান্তে চলচ্চিত্রে এমন কিছু করা হচ্ছে যা তার সম্মান ও আদর্শের পরিপন্থী। এছাড়া প্রযোজকের পাইরেসি সংক্রান্ত অনৈতিক আচরণ এবং সময়সূচির জটিলতা নিয়েও তুমুল বিরোধ তৈরি হয়, যার পরিণতিতে মান্না শেষ পর্যন্ত ছবিটি পুরোপুরি পরিত্যাগ করেন।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সেই ক্রান্তিকালে মান্নার লড়াইটা মোটেও সহজ ছিল না। পুরোনো ভিডিওতে তাকে অশ্লীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিজের গভীর হতাশা ও ক্লান্তির কথা বলতে শোনা যায়। একার পক্ষে ইন্ডাস্ট্রির এই বিশৃঙ্খল ও বাণিজ্যিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যাওয়া যে কতটা দুঃসহ ছিল, তা তার বক্তব্যে ফুটে ওঠে। প্রতিবাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে তাকে নানা ধরনের কুৎসিত আলোচনা, অপপ্রচার ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সে সময়কার ভয়াবহ পরিস্থিতি স্মরণ করে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তৎকালীন চলচ্চিত্রে কাটপিস ও অশ্লীল দৃশ্য সংযোজন করার একটি অসাধু চর্চা মহামারী আকার ধারণ করেছিল। মান্না একা এর বিরুদ্ধে চরম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং কতিপয় সৎ পরিচালক, ফাইট ডিরেক্টর ও কলাকুশলীকে একজোট করে অশ্লীলতামুক্ত মানসম্মত সামাজিক সিনেমা নির্মাণের এক দূরদর্শী উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন।

মোহাম্মদ হোসেন প্রযোজিত ও পরিচালিত এবং পলি অভিনীত ‘ফায়ার’ সিনেমাটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্কিত ইতিহাস প্রমাণ করে যে, চিত্রনায়ক মান্না কেবল ঢালিউডের একজন সফল ও বিপুল জনপ্রিয় নায়কই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রের সুস্থ ধারা ও শিল্পমানের এক আপসহীন অভিভাবক। তৎকালীন পরিচালক দেশের বাইরে অবস্থান করায় এ বিষয়ে তার নতুন কোনো বক্তব্য জানা না গেলেও, প্রকাশ্যে আসা এই পুরোনো ভিডিও আর তার স্ত্রীর সত্যোচ্চারণ মান্নার সেই আপসহীন ও প্রতিবাদী রূপটিকেই আবারও ইতিহাসের পাতায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করল।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর