অক্টোপাস জলজ জগতের এমন এক বিস্ময় যার তিনটি আলাদা হৃৎপিণ্ড রয়েছে এবং শরীরে প্রবাহিত রক্তের রঙ নীল। এর দুটি হৃৎপিণ্ড ফুলকায় রক্ত সঞ্চালন করে এবং তৃতীয় হৃৎপিণ্ডটি সারা শরীরে রক্ত প্রবাহিত রাখতে কাজ করে। এদের রক্তে তামাযুক্ত প্রোটিন বা হিমোসায়ানিন থাকায় রক্তের রঙ নীল দেখায়। অক্টোপাসের আটটি বাহুতে ছড়িয়ে থাকা নিউরন বা স্নায়ুকোষ এদের মস্তিষ্ক ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ও স্পর্শ বুঝতে সাহায্য করে।
বুদ্ধিদীপ্ত ছদ্মবেশ ও আত্মরক্ষার কৌশল
জলজ জগতের বুদ্ধিমান প্রাণীগুলোর তালিকায় অক্টোপাস বেশ শীর্ষে অবস্থান করে। যেকোনো বিপদ দেখলে এরা মুহূর্তে নিজের গায়ের রঙ ও ত্বক পরিবর্তন করে আশপাশের পাথর বা সামুদ্রিক উদ্ভিদের সাথে মিলেমিশে যেতে পারে। কোনো শক্তিশালী শিকারি প্রাণী সামনে চলে এলে এরা ক্যালিগ্রাফির কালির মতো কালো কালি স্প্রে করে জল ঘোলা করে ফেলে এবং দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। বিশেষ প্রয়োজনে শিকারির নজর ঘোরাতে এরা নিজের একটি বাহু বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যা পরবর্তীতে আবার নতুন করে গজিয়ে ওঠে।
প্রতিবছর ৮ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় বিশ্ব অক্টোপাস দিবস। অক্টোপাসের আটটি বাহু বা পা রয়েছে, আর ল্যাটিন শব্দ ‘অক্টো’ অর্থ আট এই মিল থেকেই অক্টোবর মাসের ৮ তারিখকে দিনটি পালনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। দ্য অক্টোপাস নিউজ ম্যাগাজিন অনলাইন (TONMO) ২০০৬ সালে প্রথম এই দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক গবেষণা সংস্থা ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। সমুদ্রের অন্যতম বুদ্ধিমান ও আদিমতম প্রাণী অক্টোপাসের বৈচিত্র্য তুলে ধরা, অবৈধ শিকার রোধ করা এবং মহাসাগরের বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এই দিবস উদযাপনের মূল লক্ষ্য।
বিশ্বজুড়ে যেভাবে উদযাপিত হয় বিশ্ব অক্টোপাস দিবস
বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র, অ্যাকোয়ারিয়াম এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো অত্যন্ত সাড়ম্বরে এই দিনটি উদযাপন করে। অ্যাকোয়ারিয়ামগুলোতে অক্টোপাসের বিশেষ বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন ও প্রজনন কার্যক্রম নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য অক্টোপাসের ছবি আঁকা ও বিজ্ঞান প্রদর্শনীর আয়োজন রাখা হয়। এছাড়াও সামুদ্রিক পরিবেশবিদরা সমুদ্রদূষণ রক্ষা ও অক্টোপাসের বাসস্থান সংরক্ষণে অনলাইনে ও সরাসরি নানা সেমিনার পরিচালনা করে থাকেন।
আন্তর্জাতিক রন্ধনশিল্পে অক্টোপাস
বিশ্বের বহু দেশে অক্টোপাস অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় দেশসমূহ (যেমন ইতালি, গ্রিস ও স্পেন) এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে (যেমন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) অক্টোপাসের তৈরি পদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এটি উচ্চ প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন বি-১২ এবং সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ একটি পুষ্টিকর সি-ফুড। গ্রিল্ড অক্টোপাস, সালাদ কিংবা সুপের মাধ্যমে এটি পরিবেশন করা হয়। তবে অক্টোপাসের মাংস শক্ত ও আঁশযুক্ত হওয়ায় এটি রান্নার ক্ষেত্রে বিশেষ তাপমাত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘসময় ধরে সিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে। সঠিকভাবে প্রস্তুত না করলে এটি চর্ব্য বা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
পরিবেশের ভারসাম্য ও সচেতনতার দিন
মহাসাগরের বাস্তুতন্ত্রে অক্টোপাস খাদ্যশৃঙ্খলের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে কাঁকড়া, চিংড়ি ও ছোট প্রজাতির মাছ। বর্তমানে সমুদ্রদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মাত্রাতিরিক্ত শিকারের কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য চরম ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রতিবছর ৮ অক্টোবরে সাধারণ মানুষকে এই চমৎকার প্রাণীর বৈশিষ্ট্য জানাতে এবং মহাসাগরের পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতন করতেই বিশ্ব অক্টোপাস দিবস পালন করা হয়।