Thursday 05 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

প্রবৃদ্ধি বাড়ে, মানুষের স্বস্তি কোথায়

মুহিবুল হাসান রাফি
৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৫

অর্থনৈতিক অগ্রগতি বোঝাতে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হয়। কিন্তু এই অগ্রগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে, তার হিসাব কোথায়? আয় বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয়, কর্মসংস্থান থাকলেও চাকরির নিরাপত্তা না থাকে, আর ভবিষ্যৎ কাটে অনিশ্চয়তায় তবে প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছেছে?

প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই জীবনমানের পূর্ণাঙ্গ মাপকাঠি নয়। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে প্রতিনিয়ত হিসাব কষতে হয়। সামান্য অসুস্থতা কিংবা অপ্রত্যাশিত খরচও তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নড়বড়ে করে দেয়। আয় থাকা আর নিশ্চিন্তে বাঁচার সামর্থ্য থাকা এক বিষয় নয়।কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও শুধু চাকরির সংখ্যা দিয়ে বাস্তবতা বোঝা যায় না। অনিশ্চিত বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরি হারানোর ভয় ও অসম্মানজনক কর্মপরিবেশ কর্মজীবী মানুষের স্বস্তি কেড়ে নেয়। অন্যদিকে, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়া তরুণদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তোলে। কর্মসংস্থান তাই শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি মর্যাদা ও নিরাপত্তার ভিত্তি।

বিজ্ঞাপন

শহুরে জীবনেও উন্নয়নের সঙ্গে স্বস্তির ব্যবধান স্পষ্ট। যানজট, আবাসনসংকট, দূষণ ও দুর্বল নাগরিক সেবা মানুষের সময়, অর্থ ও কর্মক্ষমতা নষ্ট করে। চিকিৎসা পেতে হয়রানি কিংবা নিরাপদ গণপরিবহনের অভাবও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায়। এসব ক্ষতির পূর্ণ হিসাব অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে না থাকলেও মানুষের জীবনে এর প্রভাব প্রতিদিন দৃশ্যমান। উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়নকে সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হলেও নাগরিকের ভোগান্তি কতটা কমল, তা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। সড়ক নির্মিত হলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না; যাতায়াতের সময় ও দুর্ভোগ কমেছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। সেবা ডিজিটাল হলেই উন্নয়ন সম্পন্ন নয়; নাগরিকের হয়রানি কমেছে কি না, তার জবাবও দিতে হবে।

মানসিক স্বস্তিকে ব্যক্তিগত বিষয় ভেবে রাষ্ট্রীয় নীতির বাইরে রাখার সুযোগ নেই। সাশ্রয়ী চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপদ পরিবহন, ন্যায্য কর্মপরিবেশ, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষা মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এসব ক্ষেত্রে নিশ্চয়তা না থাকলে প্রবৃদ্ধির ঘোষণা মানুষের উদ্বেগ কমাতে পারে না।তাই উন্নয়নের মূল্যায়নে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয়, কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য এবং নাগরিক সন্তুষ্টির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এসব বিষয়ে নিয়মিত নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে। প্রকল্প কত টাকায় শেষ হলো, শুধু তা নয় মানুষের কতটা উপকার হলো, সেই জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থনীতির সাফল্য মানুষের জীবনেই প্রতিফলিত হওয়া উচিত। প্রবৃদ্ধি যদি উদ্বেগ কমাতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা তৈরি করতে না পারে, তবে উন্নয়নের হিসাব অসম্পূর্ণ। বড় অর্থনীতি গড়ার পাশাপাশি এমন সমাজ গড়তে হবে, যেখানে মানুষ শুধু আয় করে টিকে থাকবে না, মর্যাদা ও স্বস্তি নিয়ে বাঁচতেও পারবে। কারণ অর্থনীতি মানুষের জন্য; মানুষ অর্থনীতির পরিসংখ্যান পূরণের উপকরণ নয়। প্রবৃদ্ধির প্রতিবেদনে তাই অর্থের হিসাবের পাশাপাশি মানুষের স্বস্তির হিসাবও থাকতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ