Monday 25 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নীল চোখের অভিনেতা সিলিয়ান মারফির আজ জন্মদিন

এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক
২৫ মে ২০২৬ ১৫:৩৬

হলিউডের জাঁকজমকপূর্ণ আলো আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের পেছনের মানুষটা সবসময়ই একটু আলাদা, একটু রহস্যময়। কোলাহল আর প্রচারণার আলো থেকে বহুদূরে থাকা সেই মানুষটির নীল চোখের দিকে তাকালে যেন এক শান্ত কিন্তু বিধ্বংসী ঝড়ের আভাস পাওয়া যায়। তিনি সিলিয়ান মারফি। আজ ২৫ মে, বিশ্বখ্যাত এই আইরিশ অভিনেতার এক বিশেষ জন্মদিন। ১৯৭৬ সালের এই দিনে আয়ারল্যান্ডের কর্ক কাউন্টির ডগলাস নামক এক ছোট্ট শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি, যেখানে তার বাবা-মা দুজনেই শিক্ষা খাতের সাথে যুক্ত ছিলেন। আজ ২০২৬ সালের এই ২৫ মে তারিখে এসে জীবনের ঠিক ৫০টি বসন্ত পেরিয়ে অর্ধশতক পূর্ণ করলেন এই অভিনেতা। অথচ তার রূপালী পর্দার উপস্থিতি দেখলে বোঝার উপায় নেই যে সময়ের চাকা কতটা ঘুরে গেছে। নিজের কাজের প্রতি অগাধ নিষ্ঠা, আর ব্যক্তিগত জীবনকে কঠোরভাবে আড়ালে রাখার এক অদ্ভুত স্বভাব তাকে সমসাময়িক অন্য সব তারকাদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আজ আয়ারল্যান্ডের কর্ক থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারের মঞ্চ,সবখানেই কেবল এই নীল চোখের জাদুকরের জয়গান, যিনি কোনো গিমিক ছাড়াই শুধু অভিনয়ের জোরে কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরো বিশ্ব।

বিজ্ঞাপন

সিলিয়ান মারফির এই রাজকীয় অবস্থানে পৌঁছানোর গল্পটা কিন্তু মোটেও সহজ কোনো সমীকরণ ছিল না। শৈশবে আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক পরিবারে বড় হওয়া সিলিয়ানের প্রথম প্রেম কিন্তু অভিনয় ছিল না, বরং তিনি হতে চেয়েছিলেন একজন পুরোদস্তুর রক মিউজিশিয়ান। কৈশোরের শেষ দিকে তিনি এবং তার ভাই মিলে ‘দ্য সানস অফ মিমিগ্রিন্স’ (The Sons of Mr. Green Genes) নামের একটি রক ব্যান্ড গঠন করেছিলেন এবং তাদের গান এতটাই প্রশংসিত হয়েছিল যে একটি নামী রেকর্ড লেবেল থেকে তাদের অ্যালবাম প্রকাশের চুক্তিও প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য হয়তো তাকে অন্য কোনো মহাকাব্যের অংশ করার জন্য অপেক্ষা করছিলো, তাই আইনি জটিলতা আর কম বয়সের কারণে সেই চুক্তি আর সফল হয়নি। পরবর্তীতে পরিবারের ইচ্ছায় ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক-এ আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও মন বসেনি তার। ঠিক সেই সময়েই আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় থিয়েটারের একটি নাটক ‘ডিসকো পিগস’ (Disco Pigs) তার জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। আইনের বই ছুঁড়ে ফেলে ১৯৯৬ সালে এই নাটকের মাধ্যমে পেশাদার অভিনয় জীবনে পা রাখেন সিলিয়ান। এর পরের গল্পটা শুধুই মঞ্চ থেকে পর্দায় রাজত্ব করার, যেখানে আয়ারল্যান্ডের থিয়েটার পাড়ার সেই তরুণটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ।

২০০২ সালে ড্যানি বয়েলের পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপ্টিক সাইন্স ফিকশন ছবি ‘২৮ ডেস লেটার’ (28 Days Later) দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম বড় ধাক্কা দেন সিলিয়ান মারফি। তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে যখন তার সাথে পরিচয় হয় মাস্টারমাইন্ড পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের। নোলান প্রথমে তাকে ‘ব্যাটম্যান বিগিন্স’ ছবির ব্যাটম্যান চরিত্রের জন্য অডিশন দিতে ডেকেছিলেন। সিলিয়ান ব্যাটম্যানের স্যুট পরে অডিশন দিলেও নোলান তার চোখের গভীরতা দেখে বুঝেছিলেন, এই মানুষটি সাধারণ নায়কের চেয়ে ভিলেন হিসেবে বেশি চমৎকার ফুটবেন। আর এভাবেই সৃষ্টি হলো ডিসি কমিকসের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাইকোলজিক্যাল ভিলেন ‘স্কেয়ারক্রো’ (Scarecrow)। এরপর নোলানের ‘ইনসেপশন’ (Inception) এবং ‘ডানকার্ক’ (Dunkirk) ছবিতেও মারফির অভিনয় দর্শকদের স্তব্ধ করে দেয়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুমে সিলিয়ান মারফি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন বিবিসি-র কালজয়ী ক্রাইম ড্রামা সিরিজ ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’ (Peaky Blinders)-এর থমাস শেলবি চরিত্রটির মাধ্যমে। বার্মিংহামের গ্যাংস্টার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই নিষ্ঠুর, ধূমপায়ী এবং বুদ্ধিদীপ্ত থমাস শেলবির চরিত্রে সিলিয়ানের অভিনয় তরুণ প্রজন্মকে এমনভাবে বুঁদ করে রেখেছিল যে, আজও সোশ্যাল মিডিয়া ও গুগল ট্রেন্ডসের শীর্ষ তালিকায় থমাস শেলবির নাম ঘুরে বেড়ায়।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে হলিউডের অন্যতম সেরা অভিনেতা হিসেবে কাজ করলেও একটি পরম আরাধ্য স্বীকৃতি যেন বাকি ছিল, আর সেই প্রাপ্তির খাতাটি পূর্ণ হলো ক্রিস্টোফার নোলানের মাস্টারপিস ‘ওপেনহাইমার’ (Oppenheimer) ছবির মাধ্যমে। পারমাণবিক বোমার জনক জে. রবার্ট ওপেনহাইমারের চরিত্রে সিলিয়ান মারফি যেভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, তা ছিল এককথায় অভূতপূর্ব। চরিত্রের খাতিরে তীব্র ওজন কমানো, দিনে মাত্র একটা করে কাঠবাদাম খাওয়া আর ওপেনহাইমারের ভেতরের মানসিক দ্বন্দ্বকে নিজের চোখে ফুটিয়ে তোলার যে অতিমানবীয় চেষ্টা তিনি করেছিলেন, তার ফল হাতেনাতে পান ২০২৪ সালের অস্কারের মঞ্চে। ইতিহাসের প্রথম আইরিশ বংশোদ্ভূত অভিনেতা হিসেবে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার) লাভ করেন সিলিয়ান মারফি। গোল্ডেন গ্লোব, বাফটা এবং স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডের মতো বিনোদন দুনিয়ার সব শীর্ষ সম্মাননা এক বছরে নিজের ঝুলিতে পুরে নেন তিনি। অস্কারের ট্রফি হাতে নিয়ে অত্যন্ত বিনয়ী এই অভিনেতা বলেছিলেন যে, তিনি একজন অত্যন্ত গর্বিত আইরিশম্যান হিসেবে এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।

পর্দার বাইরে সিলিয়ান মারফির জীবনটা যেন আরও বেশি আকর্ষণীয়, কারণ তিনি আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও কোনো ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন না। ২০০৪ সালে দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ইভন গিনেসকে বিয়ে করার পর দুই সন্তানকে নিয়ে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করেন তিনি, যেখানে নেই কোনো হলিউডি জাঁকজমক বা বিলাসী পার্টির আনাগোনা। চুলে স্টাইল করা, দামি ব্র্যান্ডের প্রমোশন করা বা টক শোতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গল্প করা একদমই পছন্দ নয় তার। বিনোদন দুনিয়ার এই অসামান্য প্রতিভাধর অভিনেতার ৫০তম জন্মদিনে সারাবাংলা.নেটের পক্ষ থেকে রইলো অফুরন্ত শুভেচ্ছা। পিকি ব্লাইন্ডার্সের সেই কুখ্যাত হ্যাট মাথায় দিয়ে কিংবা ওপেনহাইমারের হ্যামলক কোট গায়ে জড়িয়ে সিলিয়ান মারফি আরও বহু বছর ধরে রূপালী পর্দার দর্শকদের এভাবে সম্মোহিত করে রাখবেন, এটাই আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সিনেমা প্রেমীদের একমাত্র প্রত্যাশা।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর