বিশ্বমঞ্চে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যবাহী আসর ভেনিস উৎসবের আমেজ উদ্যাপনের সময় ইতালির ভেনিসের মেস্ত্রে শহরের এক পার্কে প্রবাসী বাংলাদেশি কতিপয় অসাধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীর হাতে ন্যক্কারজনক হেনস্তার শিকার হয়েছেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনী শেষে পরিবারসহ ঘোরার মুহূর্তে তার ওপর এই তাণ্ডব চালানো হয়। আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কিছু দুষ্কৃতকারী তার পথরোধ করে পানি ও পানীয় ছিটিয়ে দেয় এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তার গায়ে আঘাত করার পাশাপাশি মোবাইল ফোন ফেলে দেওয়া হয় এবং তাকে জোরপূর্বক রাজনৈতিক স্লোগান দিতে চাপ দেওয়া হয়। এই সময় অভিনেত্রীর সঙ্গে থাকা ছোট ভাইয়ের শিশুসন্তান ও স্বজনেরাও অপমান ও শারীরিক ধাক্কাধাক্কির শিকার হন। দেশেজুড়ে এই হিংস্র আচরণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সংস্কৃতি অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর জবাবে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মঙ্গলবার রাতে ‘সাংস্কৃতিক স্বৈরাচার রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক এক যৌথ বিবৃতি দেয় দেশের বিনোদন জগতের সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম দৃশ্যমাধ্যম সমাজ। এতে স্বাক্ষর করে আজমেরী হক বাঁধনের পাশে সুদৃঢ় সংহতি প্রকাশ করেছেন ১২২ জন খ্যাতনামা শিল্পী, নির্দেশক ও সংস্কৃতি কর্মী।
বিনোদন দুনিয়ার বিশিষ্টজনেরা এই বিবৃতিতে সরাসরি মন্তব্য করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গণআন্দোলনে স্বৈরাচারী শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সাধারণ আপামর জনতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বাঁধন। সে কারণে রাজনৈতিক আক্রোশ থেকে কোনো শিল্পীকে বিদেশে গিয়ে এমন তাণ্ডবের শিকার হতে হওয়া মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার ওপর এক চরম আঘাত। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের দেশের সম্মান বহনকারী একজন নারী শিল্পীর গায়ে হাত তোলা ও গালাগাল করার সংস্কৃতি স্বৈরাচারী মানসিকতার বিষাক্ত রূপকেই ফুটিয়ে তোলে। বিবৃতিতে দেশের একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের ছাত্র-জনতার জাগরণের চেতনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জোর দিয়ে বলা হয়, রাজনৈতিক মতের অমিল কখনোই সহিংসতার হাতিয়ার হতে পারে না। শিল্পীর মুক্ত কণ্ঠ কিংবা নীরবতাকে কোনো শক্তিই জিম্মি করতে পারবে না। অপরাধীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি তোলার পাশাপাশি সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ চান তারা।
প্রতিবাদের এ ঐতিহাসিক বিবরণীতে সংহতি জানিয়ে নাম লিখিয়েছেন দেশের বরেণ্য এবং নতুন প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক সংস্কৃতিজন। এতে স্বাক্ষর করেন আহমেদ ইবনে আরিফ, ফাহিম ইসলাম, আলরাফ পারমিজ, ইয়াসির আল হক, নাসিফ আমিন, জাহিদুল ইসলাম, জাহিদুল ইসলাম নাহিদ, সাঈদ উজাল, খন্দকার তানভীর মুরাদ, ধ্রুব হাসান, সৈয়দা নিলিমা দোলা, শিমুল সালাহউদ্দিন, সজীব তানভীর, মায়েদা তানহা, বিদুশী, নায়না রাহা, বাবুনী রহমান, মসফিকুর রহমান জোহান, মুহিব্বুল মুকতাদির তানিম, মিশুক আশরাফুল আওয়াল, আবদুল হালিম, চঞ্চল, এডিলা ফরিদ, তুরিন, আরিফ নূর, তানিম নূর, রাফসান আহমেদ, রাকিবা আমাতুল করিম, হুমায়রা বিলকিস, সালিমুল্লাহ খান, তাহমিদ চৌধুরী, মো. আল হাসিব খান, আনন্দ, তফাজ্জল হোসেন, রামশা শাহরিয়ার, সরকার প্রতীক, তাসলিমা আখতার, মনজুর আল মতিন, জহিরুল ইসলাম কোচি, সারা আহমেদ, অভিজিৎ শুভ, তানভীর আল আজাদ, আনর্য মুর্শিদ, ড. আনন এইচ. সিদ্দিকী, ফাহিম আহমেদ চৌধুরী, ফারজানা জেরীন, সুস্মিতা রায় সুপ্তি, সীমা, মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, গোলাম রাব্বানী, আবদুল্লাহ বায়েগ, মো. রায়হানুর রহমান, শায়ান, মো. সাইফুল ইসলাম, নেয়ামত উল্লাহ মাসুম, আয়মান আসিব স্বাধীন, আবিদ সরকার সোহাগ, মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ, মুশফিকুর রহমান, মোহাম্মদ রোমেল, মাহতাব উদ্দিন, মঞ্জুরুল ইকরাম, মুহাম্মদ কাইয়ুম, এম হাসান, আমিরুল রাজীব, মোহাম্মদ মনির হোসাইন, শাহ নেওয়াজ শাইকত, মো. তানভীর রহমান, অনুপম শাইকত শান্ত, তন্ময় কর্মকার, মারজিয়া মিথিলা, মনোজ প্রামাণিক, শাহ নেওয়াজ খান, জাহীন ফারুক আমিন, আবুল খায়ের মোহাম্মদ আরিকুজ্জামান, তানজিম ওয়াহাব, সায়দিয়া গুলরুখ, হাসান রোবায়েত, নাঈম উল হাসান, মোমিন সেতু, মাহমুদুল রাফিক, তাজনুভা জাবীন, মোজাহিদ, মো. জিহাদ, ফারিহা শামস শিউতি, লাবণী মণ্ডল, নাজমুস সাকিব, রফিকুজ্জামান ফরিদ, রেবেকা নীলা, অনুপ কুণ্ডু, রুবায়েত মাহমুদ, আবদুল্লাহ সেরু, মারিয়াম রূপা, ফরহাদুল আলম, তাহমিদাল জামি, আরিফ সোহেল, মাহফুজ চৌধুরী, মো. মনোয়ার হোসাইন, কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, অধ্যাপক ড. হাসান আশরাফ, আনিস রায়হান, অরুণিমা ইসলাম, মীর লোকমান, সাদিক এম আলম, রাহাত মুস্তাফিজ, স্নিগ্ধা সুলতানা, তানহা জাফরীন, মো. আবদুল ওয়াহাব সাকিন, মো. তৌহিদুল ইসলাম, নাজমুল আহমেদ, আনুশেহ আনাদিল, ফিরোজ আহমেদ, তানভীর আহসান, আকরাম খান, মো. মুন্তাসির রহমান, জান্নাতুল মাওয়া এবং এ এস এম রেজাউর রহমান। দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের সবার একাত্মতায় তৈরি এই যৌথ লড়াই কেবল বাঁধনের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই সোচ্চার নয়, বরং বিশ্ব অঙ্গনে দেশের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখতে ও যেকোনো প্রকার ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ অবস্থান তুলে ধরেছে।