জন্মদিন মানেই একসময় ছিল উৎসব, হৈচৈ আর প্রিয়জনদের ঘিরে নানা বর্ণিল আয়োজন। কিন্তু বয়স ও সময়ের পরিক্রমায় বদলে গেছে সেই উদযাপনের রূপ। এখন আর বড় কোনো কোলাহলপূর্ণ আয়োজন নয়, বরং পরিবারের কাছের মানুষদের সঙ্গে একেবারেই নিরিবিলি ও শান্তিতে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌসুমী। আজ ৩ জুলাই (৩ নভেম্বর) বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রিয়দর্শিনীর জন্মদিন। তবে বিশেষ এই দিনটি এবার দেশ বা নিজের ঘরোয়া আঙিনায় নয়, কাটছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। মা, মেয়ে ও বোনদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘরোয়া ও উষ্ণ পরিবেশে বিশেষ দিনটি কাটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার। জন্মদিন ঘিরে ব্যক্তিগতভাবে বড় কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন না থাকলেও, দেশ ও প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ভক্ত-অনুরাগীর নিখাদ ভালোবাসায় ঠিকই সিক্ত হচ্ছেন এই নন্দিত তারকা।
প্রায় তিন বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন মৌসুমী। ভৌগোলিক দূরত্বে থাকলেও তাকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনা ও ভালোবাসার কমতি নেই একটুও। প্রতিবছরের মতো এবারও ঢাকাই সিনেমার এই জনপ্রিয় নায়িকার জন্মদিন উপলক্ষে মৌসুমী ফ্যান ক্লাবের উদ্যোগে রাজধানীর ফার্মগেটে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আজ বিকেলের এই হৃদ্যতাপূর্ণ আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে তার স্বামী, চিত্রনায়ক ওমর সানীর। প্রিয় মানুষটির অনুপস্থিতিতেও দেশের মাটিতে ভক্তদের এই ভালোবাসার আয়োজন ও পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষ দোয়ার উদ্যোগ দিনটিকে করে তুলেছে আরও বিশেষ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে জন্মদিনের ভাবনা ও পরিকল্পনা শেয়ার করতে গিয়ে মৌসুমী জানান, প্রবাসের এই ঠিকানায় জন্মদিন নিয়ে তার আলাদা কোনো বড় পরিকল্পনা নেই। আম্মু, মেয়ে এবং বোনেরা মিলে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই একসঙ্গে সুন্দর কিছু মুহূর্ত কাটানোর চেষ্টা করবেন। নিজেদের মতো করে ভালোমন্দ খাওয়া দাওয়া আর ঘরোয়া আড্ডাতেই কেটে যাবে দিনটি। ঢাকায় থাকলে হয়তো একটু অন্যরকম আমেজ ও নানা আয়োজনের দেখা মিলত, তবে প্রবাসেও এই পরিজনদের সান্নিধ্য তার কাছে বিশেষ প্রাপ্তি।
জন্মদিনকে কেবল কেক কাটা বা উৎসবের দিন হিসেবে দেখেন না এই অভিনেত্রী, বরং এটি তার কাছে জীবন ও সময়ের হিসাব মেলানোর একটি সুবর্ণ উপলক্ষ। নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর ভক্তদের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, জন্মদিন মানেই জীবন থেকে আরও একটি বছর নিঃশব্দে ঝরে যাওয়া। একজীবনে কত কিছুই না করার সুপ্ত বাসনা ছিল, যার সব হয়তো আর হয়ে ওঠেনি। ঢাকায় স্বামী ওমর সানী নানা উদ্যোগ নেন, আর দেশের নানা প্রান্ত থেকে ফ্যান ক্লাবের বন্ধুরা কিংবা ভক্তরা যেভাবে দিনটি উদ্যাপন করেন, তা সত্যিই তাকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। এত দূরে থেকেও ভক্তদের এই নিঃশর্ত ভালোবাসা তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন এবং তা তাকে দারুণ আনন্দ দেয়।
শৈশবের জন্মদিনের সুমধুর স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আজও নস্টালজিক হয়ে পড়েন এই তারকা। বিশেষ করে তার বাবার মহৎ উদ্যোগগুলোর কথা তিনি পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। ছোটবেলায় তার বাবা জন্মদিনে নিয়মিত এতিমখানায় খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতেন এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের পাশে পরম মমতায় দাঁড়াতেন। বাবার সেই আদর্শ তার মনে গভীর রেখাপাত করেছে। অন্যদিকে, বাসায় বরাবরই বড় কোনো উৎসব বা নিজের জন্মদিন নিয়ে বিশেষ হৈচৈয়ের প্রতি তার নিজের কিছুটা অনাগ্রহ থাকলেও, তার মা ঠিকই পরম যত্নে নানা পদের রান্নাবান্না করতেন এবং আত্মীয়স্বজনদের ডেকে খাইয়ে আনন্দ পেতেন। মায়ের হাতের সেই রান্নার আয়োজন এবং শৈশব-কৈশোরের সেই সোনালী দিনগুলোকে আজ খুব বেশি মিস করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে প্রখ্যাত নির্মাতা সোহানুর রহমান সোহানের সাড়াজাগানো ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঢাকাই সিনেমায় সোনালী পর্দায় অভিষেক ঘটেছিল মৌসুমীর। অবিস্মরণীয় সেই চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ নায়ক প্রয়াত সালমান শাহ। প্রথম ছবিতেই দর্শক হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে তোলার পর একে একে ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’ ও ‘স্নেহ’-এর মতো ব্যবসাসফল ও নান্দনিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পরবর্তীতে চিত্রনায়ক ওমর সানীর সঙ্গে জুটি বেঁধেও উপহার দিয়েছেন একাধিক জনপ্রিয় ও দর্শকপ্রিয় সিনেমা। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় রূপালি পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি জয় করে নিয়েছেন কোটি মানুষের মন। প্রবাসের নীরবতায় কাটলেও জন্মদিনের এই বিশেষ মুহূর্তে ভক্ত-অনুরাগীদের ভালোবাসা আর শুভকামনায় বারবার ধন্য হচ্ছেন ঢাকাই সিনেমার এই জীবন্ত কিংবদন্তি।