Monday 20 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ব্রাসেলসের সেরা খাবারের খোঁজে

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:৫৪

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রশাসনিক কেন্দ্রই নয়, এটি ভোজনরসিকদের জন্য একটি স্বর্গরাজ্য। এই শহরটি তার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রন্ধনশৈলীর এক দারুণ মিলনমেলা। ব্রাসেলসের রাস্তায় হাঁটলে যে ঘ্রাণ আপনার নাকে আসবে, তা হলো তাজা ভাজা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা বেলজিয়ান ফ্রাই, সুগন্ধি ওয়্যাফল এবং উচ্চমানের চকোলেটের স্বর্গীয় ঘ্রাণ। এখানকার প্রতিটি রেস্টুরেন্ট এবং স্ট্রিট ফুড শপ এক একটি গল্পের মতো, যেখানে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার দারুণ সংমিশ্রণ ঘটেছে। বিশেষ করে গ্ল্যান্ড প্যালেস বা গ্র্যান্ড প্লাস চত্বরের আশেপাশে আপনি যখন ঘুরবেন, তখন চারপাশের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মাঝে বসেই উপভোগ করতে পারবেন বিশ্বের সেরা কিছু খাবার। ব্রাসেলসের খাবার মানেই আভিজাত্য আর তৃপ্তির এক অসাধারণ সংমিশ্রণ, যা প্রতিটি পর্যটককে বারবার মুগ্ধ করে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ঐতিহ্য ও স্ট্রিট ফুডের জাদুকরী স্বাদ

ব্রাসেলসের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আইকনিক খাবার হলো ‘মুল-ফ্রিটস’ বা ঝিনুক ও ফ্রাই। গ্র্যান্ড প্লাসের আশেপাশে অনেক পুরনো রেস্টুরেন্টে আপনি এই খাবারটি পাবেন, যা বেলজিয়ামের জাতীয় খাবারের মর্যাদা পায়। ঝিনুকের সাথে মুচমুচে ফ্রাইয়ের কম্বিনেশন আপনাকে দারুণ এক স্বাদ দেবে। তবে এর পাশাপাশি শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্ট্রিট ফুড শপগুলোতে ‘বেলজিয়ান ওয়্যাফল’ মিস করা একেবারেই অনুচিত। এই ওয়্যাফল দুই ধরনের হয়—ব্রাসেল ওয়্যাফল এবং লিয়েজ ওয়্যাফল। রাস্তার পাশের ছোট দোকানগুলোতে যখন গরম গরম ওয়্যাফলের ওপর আইসক্রিম বা চকোলেট সস ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তার স্বাদের তুলনা হয় না। এছাড়া ব্রাসেলসের ‘অস্ট্রেলিয়ান’ আইসক্রিম চেইনগুলো এখন পর্যটকদের কাছে খুবই পরিচিত। আপনি যদি দ্রুত কিছু খেতে চান, তবে এই ধরণের দোকানগুলোতে স্মুদি বা আইসক্রিমের সাথে ওয়্যাফলের কম্বিনেশন বেছে নিতে পারেন, যা দ্রুত শক্তি জোগানোর পাশাপাশি স্বাদেও দারুণ।

বাঙালির রসনা ও ব্রাসেলসের খাবার

বাঙালি পর্যটকদের জন্য ব্রাসেলসের খাবার বেশ বৈচিত্র্যময়। আমরা যারা মশলাদার বা ঝাল খাবারের ভক্ত, তাদের জন্য শুরুতে বেলজিয়ান খাবারের স্বাদ কিছুটা মৃদু মনে হতে পারে, কিন্তু এখানকার খাবারের গুণমান অতুলনীয়। বাঙালিরা এখানকার মাংসের আইটেমগুলো বেশ উপভোগ করতে পারবেন। বিশেষ করে স্টু বা সিফুড আইটেমগুলো বেশ সুস্বাদু হয়। আপনারা যদি হালাল খাবারের খোঁজ করেন, তবে ব্রাসেলসের ‘ইক্সেলস’ বা ‘সেন্ট-গিলস’ এলাকায় প্রচুর মধ্যপ্রাচ্য বা মরক্কান ঘরানার রেস্টুরেন্ট পাবেন, যেখানে হালাল খাবার সহজে মেলে। এছাড়া এখানকার বাজারে পাওয়া তাজা ফল ও দুধের সর দিয়ে তৈরি খাবারগুলো আমাদের দেশীয় স্বাদের সাথে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্রাসেলসের চকোলেট দোকানগুলোতে গিয়ে আপনারা ডার্ক চকোলেটের বিভিন্ন ভেরিয়েশন ট্রাই করতে পারেন, যা বাঙালির মিষ্টিমুখের দারুণ এক বিকল্প হতে পারে।

খরচ ও রেস্টুরেন্ট নির্বাচনের কৌশল

ব্রাসেলসে খাওয়া-দাওয়ার খরচ আপনার পছন্দের ওপর নির্ভর করবে। সাধারণ স্ট্রিট ফুড যেমন একটি ওয়্যাফল বা এক কোণ ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের দাম ৫ থেকে ১০ ইউরোর মধ্যেই হয়ে যায়। কিন্তু আপনি যদি গ্র্যান্ড প্লাসের মতো কোনো পর্যটন এলাকার নামি রেস্টুরেন্টে বসে দুপুরের বা রাতের খাবার খেতে চান, তবে প্রতি জন হিসেবে ২৫ থেকে ৫০ ইউরো খরচ হতে পারে। বাজেট সাশ্রয়ী ভ্রমণের জন্য আপনারা মূল পর্যটন কেন্দ্র থেকে একটু দূরে আবাসিক এলাকায় খেতে পারেন, সেখানে খাবারের দাম অনেক কম এবং গুণমানও চমৎকার। টিপস দেওয়ার বিষয়টি এখানে ঐচ্ছিক হলেও অনেক রেস্টুরেন্টে বিলের সাথে তা যোগ করা থাকে, তাই বিল পরিশোধের সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। মনে রাখবেন, দুপুরের খাবারের সময় অনেক স্থানীয় রেস্টুরেন্টে ‘লাঞ্চ মেনু’ বা ‘প্লেট দু জুর’ হিসেবে সাশ্রয়ী প্যাকেজ থাকে, যা একই সাথে তৃপ্তিদায়ক ও সাশ্রয়ী।

এলাকাভিত্তিক খাবারের বৈচিত্র্য

আপনি যদি ব্রাসেলসের প্রাণকেন্দ্রে থাকেন, তবে গ্র্যান্ড প্লাস ও তার আশেপাশের অলিগলিতে পাবেন ঐতিহ্যবাহী বেলজিয়ান খাবারের সমাহার। আর আপনি যদি বৈশ্বিক খাবারের স্বাদ খুঁজছেন, তবে ‘সেন্ট-ক্যাথরিন’ এলাকাটি আপনার জন্য সেরা গন্তব্য। এই এলাকাটি তার সি-ফুড রেস্টুরেন্টগুলোর জন্য বিখ্যাত। অন্যদিকে, শহরের ‘চাউসি ডি ইক্সেলস’ রাস্তায় গেলে আপনি বিভিন্ন দেশের খাঁটি স্বাদের খাবারের দেখা পাবেন, যা অনেকটা কসমোপলিটান বা আন্তর্জাতিক মানের। আর যদি হালকা নাস্তা বা আইসক্রিম-ওয়্যাফলের মতো কিছু খুঁজছেন, তবে শহরের যেকোনো শপিং মলের সামনে বা ব্যস্ত মেট্রো স্টেশনগুলোর আশেপাশে অবস্থিত চেইন শপগুলোতে ঢুঁ মারতে পারেন। সব মিলিয়ে, ব্রাসেলসের প্রতিটি এলাকা আপনাকে খাবারের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেবে, তাই সময় নিয়ে ঘুরে প্রতিটি স্বাদের খোঁজ নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

খাবারের দাম ও বাজেট সাশ্রয়ী কৌশল

ব্রাসেলসের খাবারের দামের বিষয়টি বেশ চমৎকারভাবে সাজানো। ইউরোপের অন্যান্য শহরের তুলনায় ব্রাসেলসে খাবারের খরচকে ‘মাঝারি’ মানের ধরা হয়। আপনার বাজেট এবং পছন্দের ওপর ভিত্তি করে খরচ কীভাবে ওঠানামা করে, তার একটি বিস্তারিত ধারণা নিচে দেওয়া হলো:

সাধারণ স্ট্রিট ফুড ও হালকা খাবার

শহরে ঘুরতে ঘুরতে যদি খুব দ্রুত কিছু খেতে চান, তবে স্ট্রিট ফুডই সেরা ভরসা। একটি গরম বেলজিয়ান ওয়্যাফল, যার ওপর চকোলেট সস বা ফ্রুটস টপিং দেওয়া থাকে, তার দাম সাধারণত ৩ থেকে ৬ ইউরোর মধ্যে থাকে। জনপ্রিয় সব চেইন শপ (যেমন: অস্ট্রেলিয়ান) বা রাস্তার ধারের ছোট দোকানগুলোতে এগুলো অনায়াসেই পাবেন। এছাড়া এক কোণ ফ্রেন্স ফ্রাইয়ের দাম পড়বে ৩ থেকে ৫ ইউরো। এই খাবারগুলো বেশ তৃপ্তিদায়ক এবং বাজেটের মধ্যে থাকে।

দুপুরের খাবারের (লাঞ্চ) খরচ

দুপুরে ব্রাসেলসের রেস্টুরেন্টগুলোতে অনেক জায়গায় ‘লাঞ্চ মেনু’ বা ‘প্লেট দু জুর’ (দিনের সেরা খাবার) পাওয়া যায়। এটি বেশ সাশ্রয়ী। একটি রেস্টুরেন্টে সাধারণ দুপুরের খাবারের প্যাকেজ নিতে চাইলে আপনার খরচ হতে পারে ১৫ থেকে ২০ ইউরো। এর মধ্যে সাধারণত একটি প্রধান খাবার এবং পানীয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। আপনি যদি পর্যটন এলাকাগুলো যেমন, গ্র্যান্ড প্লাস বা সেন্ট-ক্যাথরিনের মতো জায়গা এড়িয়ে একটু ভেতরের দিকে বা স্থানীয় লোকালয়ে খান, তবে একই খাবার আপনি ১০-১২ ইউরোতেও পেয়ে যেতে পারেন।

রাতের খাবার (ডিনার) ও ভোজনবিলাস

রাতে সাধারণত মানুষ কিছুটা আয়েশ করে খায়, তাই খরচ একটু বেড়ে যায়। একটি মাঝারি মানের রেস্টুরেন্টে একজনের রাতের খাবার ও পানীয় মিলিয়ে খরচ হতে পারে ২৫ থেকে ৪০ ইউরো। তবে আপনি যদি একটু প্রিমিয়াম বা ভালো মানের সি-ফুড রেস্টুরেন্টে ঝিনুক বা মাছের কোনো বিশেষ আইটেম খেতে চান, তবে মাথাপিছু খরচ ৫০ ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে। বেলজিয়ামে খাবারের সাথে ওয়াইন বা স্থানীয় বিয়ার নেওয়ার প্রবণতা বেশি, তাই আপনি যদি পানীয় যোগ করেন, তবে বিলের অংকটা সেই অনুপাতে বাড়বে।

বাজেট সাশ্রয়ের কিছু টিপস

ব্রাসেলসে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। প্রথমত, ট্যাপের পানি পান করার অভ্যাস করুন। রেস্টুরেন্টে বোতলজাত পানির দাম বেশ বেশি, কিন্তু ট্যাপের পানি পান করা এখানে একদম নিরাপদ এবং বিনামূল্যে পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন বড় রেস্টুরেন্টে না খেয়ে স্থানীয় সুপারশপগুলো (যেমন—Delhaize, Carrefour) থেকে স্যান্ডউইচ, সালাদ বা তৈরি খাবার কিনে নিতে পারেন, যা আপনার প্রতিদিনের খরচ অর্ধেক কমিয়ে দেবে। সবশেষে, স্থানীয়দের ভিড় থাকে এমন ছোট ক্যাফেগুলোতে খাবার খুঁজুন, কারণ নামি-দামি পর্যটন কেন্দ্রের বাইরের রেস্টুরেন্টগুলোতে খাবারের মান যেমন ভালো হয়, দামও থাকে নাগালের মধ্যে।

ছবি: লেখক

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর