বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্যানভাসে যে কজন মানুষের নাম গভীর কালিতে লেখা রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সম্মুখ সারির বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে যখন পুরো জাতি একটি চূড়ান্ত দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল, তখন তার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল কোটি বাঙালির সাহসের উৎস। আজ ৩০ মে, ইতিহাসের এই ক্ষণজন্মা মানুষের ৪৫তম শাহাদত বার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে এক নির্মম সেনা অভ্যুত্থানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তার পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন সরকারি রসায়নবিদ। শৈশব ও কৈশোরের একটা বড় অংশ কলকাতায় কাটার পর, দেশভাগের জেরে তার পরিবার করাচিতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভ করেন। একজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে তিনি নজর কাড়েন। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়ে চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব নেন।
১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এ দেশের মানুষের ওপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা শুরু করে, তখন চট্টগ্রামে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করা বাঙালি অফিসারদের অন্যতম ছিলেন মেজর জিয়া। ২৬শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন তিনি। সেই ঘোর অমানিশার মধ্যে ইথারে ভেসে আসা তার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ ও দিকভ্রান্ত বাঙালি জাতিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে গঠিত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম নিয়মিত শৌর্যদীপ্ত ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’। রৌমারী, বাহাদুরাবাদ ঘাট ও সিলেট অঞ্চলে জেড ফোর্সের অসমসাহসী অপারেশনগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে চরম উথাল-পাথাল তৈরি হয়, তার সূত্র ধরে ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। প্রথম দিকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর তিনি দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বৈদেশিক নীতিতে এক বড় ধরনের রূপান্তর নিয়ে আসেন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ এবং ‘খাল খনন আন্দোলন’ শুরু করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে কৃষিতে উদ্বৃত্ত ফসল ফলানো। নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে ‘বাঙালি’র পরিবর্তে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণাটির প্রবর্তন করেন। তার দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের এক অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটে, যা বাংলাদেশের জন্য জনশক্তি রপ্তানির বিশাল দুয়ার উন্মোচন করে। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তির জন্য ‘সার্ক’ গঠনের মূল রূপরেখা ও ভিত্তি তৈরি হয়েছিল তার হাত ধরেই।
রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের এই কর্মময় জীবন ও রাজনৈতিক দর্শনকে তার দল ও অনুসারীরা অত্যন্ত উচ্চ আসনে মূল্যায়ন করে থাকেন। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের মতে, ব্যক্তি হিসেবে বিশ্লেষণ করলে জিয়াউর রহমান অনেক ঊর্ধ্বে, তাকে নতুন করে ওঠানোর কিছু নেই এবং তার প্রকৃত স্থান মিশে আছে দেশের মানুষের হৃদয়ে। জিয়াউর রহমান দেশের রাজনীতিতে একটি সুস্থ সহাবস্থান তৈরি করেছিলেন। তার সততা ও কর্মময় জীবন সম্পর্কে পুরো দেশবাসী অবগত।
তবে এই দূরদর্শী ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে দলীয় পরিমণ্ডলে মনে করা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে তার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সামরিক কোন্দল হিসেবে দেখেন না দলটির শীর্ষ নেতারা। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী’র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে গভীর আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সমীকরণ ছিল। তার মতে, তৎকালীন আগ্রাসী শক্তিরা বুঝতে পেরেছিল যে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকলে এ দেশে কোনো ধরনের আধিপত্য বা আগ্রাসন চালানো সহজ হবে না; আর ঠিক একারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়।
১৯৮১ সালের মে মাসের শেষের দিকে একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ মেটানোর উদ্দেশ্যে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে যান এবং ৩০শে মে ভোরে একদল উগ্র সেনাসদস্যের অতর্কিত হামলায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে গুলিতে নিহত হন। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে অবসান ঘটে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও কর্মময় জীবনের। ঢাকায় তার জানাজায় তৎকালীন সময়ে লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জানাজা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। তার রাজনৈতিক জীবন ও শাসনামল নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা এবং ভিন্নতর ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তন এবং রাষ্ট্র গঠনে দূরদর্শী সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদান অনস্বীকার্য। ৪৫তম শাহাদত বার্ষিকীতে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক: সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, সারাবাংলা ডটনেট