Monday 25 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বরফের রাজ্যে এক অদৃশ্য মৃত্যুর ফাঁদ ‘আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল’

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৫ মে ২০২৬ ১৯:৫৫

বিশ্বজুড়ে সাগরের বুকে লুকিয়ে থাকা ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ বা ডেভিলস ট্রায়াঙ্গলের রহস্য নিয়ে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। কিন্তু এই পৃথিবীর বুকেই এমন এক স্থলভাগ রয়েছে, যার রহস্য ও ভয়ংকরতা বারমুডাকেও অনায়াসে হার মানায়। আমেরিকার বরফাবৃত ও রহস্যময় রাজ্য আলাস্কার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বুকে লুকিয়ে রয়েছে এক অদৃশ্য মৃত্যুর ফাঁদ, যা বিশ্বজুড়ে ‘আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত। আলাস্কার দক্ষিণে অ্যাঙ্কোরেজ, পশ্চিমে জুনো এবং উত্তরে উতকিয়াগভিক (সাবেক ব্যারো) নামের তিনটি অঞ্চলকে কাল্পনিক রেখা দিয়ে যুক্ত করলে যে বিশাল ও দুর্গম ত্রিকোণাকার অঞ্চলের সৃষ্টি হয়, তাকেই মূলত এই হাড়হিম করা নামে ডাকা হয়। প্রথম নজরে পাইন বনে ঘেরা শান্ত, তুষারাবৃত ও নয়নকাড়া সুন্দর মনে হলেও, এই অঞ্চলের ইতিহাস অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী এবং রহস্যে ঘেরা। গত শতাব্দীর সত্তর দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছেন, যা আমেরিকার অন্য যেকোনো অঞ্চলের নিখোঁজ সংখ্যার হারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এই দুর্গম বরফের গোলকধাঁধায় যারা একবার হারিয়ে যান, তাদের আর কোনোদিন জীবিত বা মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

হেইল বগস ট্র্যাজেডি

আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে রহস্যের ডালপালা রাতারাতি আলোড়ন তৈরি করার পেছনে রয়েছে ১৯৭২ সালের অক্টোবরের একটি ঐতিহাসিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সেদিন মার্কিন কংগ্রেসের হাউস মেজরিটি লিডার হেইল বগস এবং নিক বেগিচ নামের দুই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের বহনকারী একটি ছোট টুইন-ইঞ্জিন বিমান আলাস্কার আকাশসীমায় প্রবেশ করার পর হঠাৎ করেই রাডার থেকে চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতাদের খুঁজে বের করতে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধার অভিযান শুরু করেছিল। টানা ৩৯ দিন ধরে ৩ লাখ বর্গমাইলেরও বেশি এলাকা জুড়ে ডজন ডজন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং শত শত উদ্ধারকর্মী দিনরাত তল্লাশি চালিয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়ের শেষ এখানেই যে, সেই বিমানের একটি ভাঙা টুকরো, জ্বালানি তেলের দাগ কিংবা আরোহীদের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেন বিশাল এক অলৌকিক হাত বিমানটিকে শূন্য আকাশ থেকে পেটের ভেতর গিলে ফেলেছিল। এই হাই-প্রোফাইল ট্র্যাজেডির পর থেকেই বিশ্ব মিডিয়ার নজর কাড়ে আলাস্কা ট্রায়াঙ্গল এবং বেরিয়ে আসতে থাকে সাধারণ পর্যটক, স্থানীয় আদিবাসী ও পর্বতারোহীদের একের পর এক নিখোঁজ হওয়ার রোমহর্ষক সব ঘটনা।

এলিয়েন ঘাঁটির অতিপ্রাকৃত মিথ

যখনই কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের নিখোঁজ রহস্যের কোনো কূল-কিনারা পাওয়া যায় না, তখনই মানুষের লোকগাথা ও অতিপ্রাকৃত তত্ত্ব ডানা মেলতে শুরু করে। আলাস্কার প্রাচীন আদিবাসী ‘ত্লিংগিত’ (Tlingit) সম্প্রদায়ের মানুষেরা বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বাস করে আসছে যে, এই গভীর বনের ভেতরে ‘কুশতাকা’ (Kushtaka) নামের এক অর্ধ-মানব ও অর্ধ-উদ্বিড়ালের মতো রূপ পরিবর্তনকারী ভয়ানক জলদানব বাস করে। লোকগাথা অনুযায়ী, এই কুশতাকা দানবটি বনে পথ হারিয়ে ফেলা নিঃসঙ্গ পর্যটকদের সামনে পরম বন্ধুর ছদ্মবেশে হাজির হয় এবং তাদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে গভীর জলাশয়ে বা বরফের গুহায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করে তাদের আত্মাকে বন্দী করে ফেলে। আবার আধুনিক ইউএফও (UFO) গবেষকদের একাংশের মতে, আলাস্কার এই দুর্গম বরফাবৃত পাহাড়গুলোর নিচে ভিনগ্রহের উন্নত প্রাণীদের এক গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড বেস বা ঘাঁটি রয়েছে। তাদের দাবি, ওই অঞ্চলে তীব্র মাত্রার ইউএফও কার্যকলাপ দেখা যায় এবং এলিয়েনরাই মূলত গবেষণার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর মানুষ ও বিমানগুলোকে প্রযুক্তির সাহায্যে তুলে নিয়ে যায়। যুগের পর যুগ ধরে এই ধরণের রোমাঞ্চকর সব গালগল্প আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলকে রহস্যপ্রেমীদের কাছে এক লোভনীয় বিষয় বানিয়ে রেখেছে।

ভূ-চৌম্বকীয় ঘূর্ণাবর্ত

অতিপ্রাকৃত মিথ বা দানবের গল্প সরিয়ে রেখে আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানী, ভূ-তাত্ত্বিক এবং স্যাটেলাইট বিশেষজ্ঞরা যখন আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলের ওপর নিবিড় গবেষণা শুরু করলেন, তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃতির এক জটিল বৈজ্ঞানিক খেলা। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অঞ্চলে তীব্র শক্তিশালী ‘ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ভর্টেক্স’ (Electromagnetic Vortex) বা ভূ-চৌম্বকীয় ঘূর্ণাবর্তের অস্তিত্ব রয়েছে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের এই অনিয়মিত ও তীব্র ওঠানামার কারণে এই অঞ্চলে প্রবেশ করা বিমান বা জাহাজের নেভিগেশনাল কম্পাস ও রাডার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়, যার ফলে বৈমানিকেরা দিকভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। এছাড়া আলাস্কার এই অঞ্চলের আবহাওয়া অত্যন্ত খামখেয়ালি; মুহূর্তের মধ্যে সেখানে তীব্র তুষারঝড় বা ‘হোয়াইটআউট’ (Whiteout) শুরু হয়, যার ফলে চোখের সামনে কয়েক ইঞ্চি দূরের জিনিসও আর দেখা যায় না। এই তীব্র ঠাণ্ডা এবং ঝড়ের কবলে পড়ে কোনো বিমান বিধ্বস্ত হলে বা কোনো মানুষ মারা গেলে, কয়েক মিনিটের মধ্যে তা কয়েক ফুট পুরু বরফের স্তরের নিচে ঢাকা পড়ে যায়।

চলন্ত হিমবাহের গ্রাস

ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণায় আরও একটি অকাট্য সত্য বেরিয়ে এসেছে, যা আলাস্কা ট্রায়াঙ্গলে নিখোঁজদের মৃতদেহ খুঁজে না পাওয়ার আসল কারণ ব্যাখ্যা করে। আলাস্কার এই ত্রিকোণাকার অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার বিশাল ও জীবন্ত ‘গ্লেসিয়ার’ বা চলন্ত হিমবাহ। এই হিমবাহগুলোর ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয় শত শত ফুট গভীর ও অদৃশ্য ফাটল, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ক্র্যাভাস’ (Crevasse)। উপর থেকে পাতলা বরফের চাদরে ঢাকা থাকায় এই ফাটলগুলো খালি চোখে একদমই দেখা যায় না। কোনো অসতর্ক পর্বতারোহী বা পর্যটক এর ওপর পা দেওয়া মাত্রই সোজা পাতালের মতো গভীর বরফের ফাটলে পড়ে যান এবং তুষার ধসের কারণে মুহূর্তের মধ্যে সেই ফাটল চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া চলন্ত হিমবাহগুলো প্রতি বছর কয়েক ইঞ্চি থেকে কয়েক ফুট পর্যন্ত ধীরে ধীরে স্থান পরিবর্তন করে, যার ফলে কোনো বিমান ভেঙে পড়লেও তা সময়ের সাথে সাথে বরফের নিচে কয়েক মাইল দূরে সরে যায় এবং আক্ষরিক অর্থেই প্রকৃতির এক বিশাল ফ্রিজের ভেতর চিরতরে দাফন হয়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সম্ভবত বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মতো এই রহস্যেরও সমাধান হবে না।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর