Thursday 23 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মঞ্চের নেপথ্যে সেই রহস্যময় জাদুকর: যার কলমে কথা বলে বিশ্ব

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৩১

স্ট্রোটফোর্ড আপন অ্যাভন নামের শান্ত এক মফস্বল শহর। চারদিকে বসন্তের হাওয়া বইছে। চারশ বছরেরও বেশি সময় আগের এক গোধূলি বেলায় এক দম্পতি তাদের নবজাতককে নিয়ে গির্জায় হাজির হলেন। তখন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, এই শিশুটিই একদিন দস্তাবেজ ছাড়াই শাসন করবে গোটা বিশ্বের হৃদয়ে। তার কোনো রাজমুকুট থাকবে না, থাকবে শুধু একটি পালকের কলম আর অফুরন্ত শব্দভাণ্ডার। তিনি আর কেউ নন, বিশ্বসাহিত্যের মহানায়ক উইলিয়াম শেক্সপিয়র। আজ ২৩ এপ্রিল, সেই বিশ্বসাহিত্যের মহানায়কের মৃত্যুদিন। ১৬১৬ সালের ২৩ এপ্রিল ইংরেজি সাহিত্যের এই প্রবাদপ্রতিম নাট্যকার ও কবির মৃত্যু হয়। মজার ব্যাপার হলো, ধারণা করা হয় ১৫৬৪ সালের এই একই তারিখেই তার জন্ম হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

পরিচয়-ই যখন এক রহস্যের জাল

শেক্সপিয়রকে নিয়ে মজার ব্যাপার হলো, তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক তথ্যই আজও কুয়াশাচ্ছন্ন। এমনকি তার নামের সঠিক বানানটি কী, তা নিয়ে খোদ গবেষকদের মধ্যেই বিতর্ক আছে। তিনি নিজে তার নাম কখনো ‘Shappere’, কখনো ‘Shakespeare’ আবার কখনো ‘Shaxberd’ হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন। অথচ মজার বিষয় হলো, আজ সারা পৃথিবী একটি নির্দিষ্ট বানানেই তাকে চেনে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সমসাময়িক অনেক পণ্ডিতই টিপ্পনী কাটতেন। তাকে বলা হতো ‘পড়াশোনা না জানা এক গ্রাম্য যুবক’। কিন্তু সেই ‘অল্প শিক্ষিত’ মানুষটিই ইংরেজি ভাষায় প্রায় ৩ হাজার নতুন শব্দ উপহার দিয়েছেন, যা আজও আমরা প্রতিদিনের কথোপকথনে ব্যবহার করি।

নাটকের মঞ্চে এক অদ্ভুত অভিনেতা

অনেকেই তাকে শুধু নাট্যকার হিসেবে চেনেন, কিন্তু শেক্সপিয়রের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল অভিনেতা হিসেবে। তিনি নিজের নাটকে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে পছন্দ করতেন। কথিত আছে, তার লেখা অমর নাটক ‘হ্যামলেট’-এ তিনি প্রেতাত্মার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ভাবুন তো, যে মানুষটি হাজারো চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিজেই নিজের মঞ্চে ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! তার অভিনয়ের এই নেশাই তাকে গ্লোব থিয়েটারের মালিকানায় পৌঁছে দিয়েছিল।

ভবিষ্যদ্বাণী আর অভিশপ্ত সমাধি

শেক্সপিয়র শুধু নাটকেই নাটকীয়তা রাখতেন না, নিজের শেষ বিদায়ের বেলাতেও এক অদ্ভুত রসিকতা করে গেছেন। তিনি জানতেন, সে আমলে পুরনো সমাধি খুঁড়ে নতুন কবর দেওয়ার প্রচলন ছিল। তাই তিনি তার সমাধিফলকে নিজেই একটি সতর্কবাণী বা অনেকটা ‘অভিশাপ’ লিখে দিয়ে গেছেন। সেখানে লেখা আছে, যে ব্যক্তি এই সমাধি পাথর নাড়াচাড়া করবে না, সে আশীর্বাদ পাবে; আর যে তার হাড়গোড় স্থানান্তরিত করার চেষ্টা করবে, সে অভিশপ্ত হবে। আজ পর্যন্ত সেই অভিশাপের ভয়েই কি না কে জানে, শেক্সপিয়রের সমাধি কেউ স্পর্শ করার সাহস দেখায়নি।

শব্দের জাদুকর এবং আধুনিক যুগ

আমরা যখন বলি ‘Love is blind’ (ভালোবাসা অন্ধ) কিংবা কাউকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলি ‘Good riddance’, তখন অবচেতন মনেই আমরা এই ভদ্রলোকের উদ্ধৃতি ব্যবহার করি। তার নাটকে যেমন ছিল নিখুঁত কমেডি, তেমনি ছিল হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো ট্র্যাজেডি। তার নাটকগুলো পড়ার চেয়ে দেখার জন্য বেশি জনপ্রিয় ছিল। সে সময় লন্ডনের সাধারণ মানুষ, যারা হয়তো অক্ষরজ্ঞানহীন ছিল, তারাও শেক্সপিয়রের মঞ্চে উপচে পড়ত শুধু মানুষের বিচিত্র অনুভূতির স্বাদ পেতে।

শেষ অঙ্ক যখন প্রথম অঙ্কের সাথে মেলে

ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমাপতন হলো তার প্রয়াণ। ১৬১৬ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। জীবনীকারদের মতে, দিনটি ছিল তার ৫২তম জন্মদিন। ঠিক যেদিন পৃথিবীতে এসেছিলেন, ঠিক সেই তারিখেই তিনি জীবনের মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন যেন কোনো নিখুঁত চিত্রনাট্যের শেষ দৃশ্য। তিনি হয়তো আজ নেই, কিন্তু প্রতিটি মঞ্চে, প্রতিটি চলচ্চিত্রে কিংবা প্রেমিকের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে উইলিয়াম শেক্সপিয়র আজও চিরঞ্জীব।

তিনি তার এক সনেটে লিখেছিলেন, ‘যতদিন মানুষ নিঃশ্বাস নেবে কিংবা চোখের দৃষ্টি থাকবে, ততদিন আমার এই লেখা বেঁচে থাকবে এবং তোমাকে জীবন দান করবে।’ আজ কয়েকশ বছর পর কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি আজও সেই পালকের কলমের জাদু ম্লান করতে পারেনি।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর