ভিয়েতনামের একেবারে উত্তর প্রান্তে মে ও ভাক জেলার দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম ‘খাও ভাই লাভ মার্কেট’। বছরের ৩৬৪ দিন পথঘাট খাঁ খাঁ করলেও চন্দ্রবছরের তৃতীয় মাসের ২৭ তারিখে এই ছোট্ট লোকালয় ভেসে যায় বিচিত্র সব উৎসবের রঙে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও বিষম খাড়া পথ পেরিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে হাজির হয় হাজার হাজার তরুণ-তরুণী ও বয়স্ক দম্পতি। অবাক করার বিষয় হলো, কেনাকাটার ঝুলিতে কোনো আলুর বস্তা কিংবা প্রাত্যহিক বাজার সদাই নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এখানে নেই। পাহাড়ের শীতল বাতাসে দূর থেকে ভেসে আসে বাঁশির করুণ সুর আর লোকসংগীতের প্রতিধ্বনি। সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকারা জীবনসঙ্গী হতে না পেরে যে অধরা আক্ষেপ বুকে চেপে জীবন পার করছেন, সেই হারানো ভালোবাসা ও পুরনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বছরের একটি বিশেষ দিন একে অপরের পাশে বসতেই শত শত বছর ধরে চলে আসা এই অভাবনীয় সামাজিক আয়োজন।
এক ট্র্যাজিক প্রেমের শতবর্ষী রক্তদান প্রতিশ্রুতি
এই অদ্ভুত হাটের পেছনে রয়েছে এক শতাব্দী পুরোনো লোকগাথা, যা কোনো রোমান্টিক থ্রিলারের নাটকীয়তাকেও টেক্কা দেয়। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, দুই ভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক দরিদ্র যুবক এবং এক ধনী সর্দারের কন্যার মধ্যে গড়ে উঠেছিল গভীর অনুরাগের সম্পর্ক। তাদের ধর্ম, ঐতিহ্য ও পারিবারিক সামাজিক মর্যাদা এক না হওয়ায় দুই গোত্রের মধ্যে হিংসাত্মক রক্তক্ষয়ী রক্তারক্তি লেগে যায়। নিজেদের অন্ধ ভালোবাসার জন্য স্বজাতিদের এই প্রাণঘাতী সংঘর্ষ সইতে না পেরে দুই প্রেমী সিদ্ধান্ত নেয় তারা কখনো বিয়ে করবে না, যাতে দুই পরিবারের যুদ্ধ থেমে যায়। বিদায়বেলায় আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে তারা শপথ করে, বছর ঘুরে ঠিক এই চন্দ্রতিথিতে তারা চিরকাল এই পাহাড়ি খাঁজে দেখা করবে। সেই ট্র্যাজিক ত্যাগের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতেই ১৯১৯ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় এই বিশেষ উৎসব, যার মূল কথা হলো বিচ্ছেদের কষ্টকে শ্রদ্ধায় রূপান্তর করা।
পরকীয়ার ভয় ভুলে সেখানে স্বামী-স্ত্রীর হাসিমুখ
আমাদের চেনা আধুনিক সমাজব্যবস্থায় সাবেক সঙ্গীর সাথে দেখা করতে যাওয়া মানেই ঝগড়া, সন্দেহ আর ডিভোর্সের শঙ্কা। কিন্তু খাও ভাই পাহাড়ের সামাজিক নীতি সম্পূর্ণ বিপরীত নিয়ম মেনে চলে। এখানে বিবাহিত নারী বা পুরুষ পরম নিশ্চিন্তে তাদের বর্তমান জীবনসঙ্গীকে সাথে নিয়েই হাটে উপস্থিত হয়। স্বামী নিজের স্ত্রীকে সাবেক প্রেমিকের সাথে একান্তে কথা বলতে ছেড়ে দিয়ে অন্য প্রান্তে বন্ধুদের সাথে সময় কাটায় কিংবা নিজের সাবেক প্রেমিকার খোঁজে লোকালয়ের ভিড়ে মিশে যায়। এখানে কোনো ঈর্ষা বা সন্দেহ নেই, কারণ সবার বিশ্বাস এক দিনের এই সাক্ষাৎ কেবলই স্মৃতির রোমান্থন এবং একটি বছরের জমে থাকা দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করার পবিত্র মঞ্চ। ভোর হতেই সব আবেগ পেছনে ফেলে সবাই আবার নিজের বর্তমান সংসার আর প্রতিদিনের চিরচেনা রুটিন জীবনের কাজে স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে যায়।
পাহাড়ে পাহাড়ে আজ ভালোবাসার জয়গান
পুরো পাহাড়ি উপত্যকা জুড়ে যখন রাত নেমে আসে, তখন চারপাশ সাজে নানা রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে। হাতে হাতে থাকে লোকজ বাঁশি, চাল দিয়ে তৈরি পানীয় এবং ঐতিহ্যবাহী রুটি। আধুনিক পর্যটন ও সোশ্যাল মিডিয়ার তীব্র প্রসারের কারণে আজকাল এই গোপন ভালোবাসার হাটে প্রচুর বিদেশি পর্যটক আর কৌতূহলী জনতার ঢল নামে। কেবল পুরনো সম্পর্ক ঝালাই নয়, পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন জীবনসঙ্গী খোঁজারও এটি এক বড় সুযোগ। সভ্যতার এতো ছোঁয়া সত্ত্বেও এই মেলা শেখায় যে সব ভালোবাসার পরিণতি বিয়েতে না পৌঁছালেও সম্পর্কের প্রতি পারস্পরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।