Monday 12 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কলম্বাসের সেই ভুল থেকে শেখার দিন আজ

ফারহানা নীলা
১২ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:২১

ইতিহাসের পাতায় ভূগোলের হিসাব বদলে দেওয়া এক অদ্ভুত মোড়! ১৪৯২ সালের অক্টোবরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে এক নাবিক নামলেন অজানা এক দ্বীপে। ভেবেছিলেন ভারতের মশলা আর সোনা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, অথচ পা রেখেছিলেন সম্পূর্ণ এক নতুন পৃথিবীতে! সেই নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস আর তার সেই এক ভুল ধারণা থেকে বদলে যাওয়া মানচিত্রের গল্প আজও দুনিয়াকে থমকে দেয়। পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে সেই কাঠের জাহাজের পাল তোলার ঘটনাটি কেবল একটি তারিখ বা ছুটির দিন হয়ে আটকে থাকেনি, বরং আধুনিক সার্চ ইঞ্জিন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে এক বিশাল বাকযুদ্ধে!

আটলান্টিকের ঢেউ আর কলম্বাসের ভুল মানচিত্র

বিজ্ঞাপন

চৌদ্দশ বিরানব্বই সালের অগাস্ট মাসে স্পেনের বন্দর থেকে তিনটি ছোট জাহাজ নিয়ে যখন কলম্বাস যাত্রা শুরু করেন, তখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল এশিয়ার অপার ধনসম্পদ আর ব্যবসার বিপুল সুযোগ। কিন্তু টানা দুই মাস আটলান্টিক মহাসাগরের সীমাহীন জলরাশিতে ভাসতে ভাসতে নাবিকদের ধৈর্য যখন একদম শেষ সীমান্তে, তখনই ১২ অক্টোবরের ভোরে হঠাৎ ভেসে আসে ডাঙার সংকেত। বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই তটে নেমে কলম্বাস লালমাটির বুকে স্পেনের পতাকা পুঁতে দিলেন, স্থানীয় মানুষকে ভেবে বসলেন ভারতীয় বা ‘ইন্ডিয়ান’। সেই ভুল কিন্তু ঐতিহাসিক এক রূপ নিল! ইউরোপীয়দের কাছে এটি ছিল এক নতুন দুনিয়া আবিষ্কারের মহা উৎসব, কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দীর্ঘ এক শোষণ ও দখলের ইতিহাস। কাঠের নৌকার সেই ছোট নোঙর ফেলে দেওয়া দৃশ্যটি আজও আমেরিকার ইতিহাস বইয়ের সবচেয়ে বেশি আলোচিত পৃষ্ঠা।

উৎসবের নাম পরিবর্তন আর বৈচিত্র্যের জোয়ার

আমেরিকায় সুদীর্ঘ বছর ধরে অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সোমবার মহাসমারোহে ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে কলম্বাস দিবস। রাস্তায় সুন্দর প্যারেড, লাল-সবুজ পতাকা আর উৎসবের আনন্দে মেতে উঠত পুরো দেশ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ইতিহাস দেখার চশমা বদলে গেল। প্রশ্ন উঠল, যে জমিতে হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ বাস করছিল, সেখানে অচেনা কেউ এসে কীভাবে দাবি করেন যে তিনি সেই ভূমি আবিষ্কার করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গত কয়েক দশকে পাল্টে গেছে উৎসবের সুর ও গতিপথ। অনেক দেশ ও রাজ্যে কলম্বাসের নাম বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে স্থানীয় আদিবাসী মানুষদের সম্মান জানানোর দিন। ইতিহাসের ভুল সংশোধন আর সব জাতির নিজস্ব সংস্কৃতিকে সামনে নিয়ে আসার এই জোয়ার এখন বিশ্বজুড়ে এক নতুন সচেতনতার উন্মেষ ঘটাচ্ছে।

লাতিন আমেরিকার বদলে যাওয়া সুর ও সম্প্রীতি

উত্তরের জলছাপ ছাড়িয়ে যখন লাতিন আমেরিকার দিকে চোখ যায়, তখন এই উদযাপনের ছবিটা আরও রঙিন ও গভীর হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোসহ আশেপাশের অনেক দেশে আগে দিনটিকে বলা হতো ‘দিয়া দে লা রাসা’ বা জাতির দিন। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে তারা সেই পুরোনো পরিচিতি ঝেড়ে ফেলেছে। আর্জেন্টিনা ২০১০ সালে সরকারি আদেশ জারি করে এই দিনটির নাম বদলে দিয়েছে ‘সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সম্প্রীতির দিন’। সেখানে এখন আর কোনো একজন ব্যক্তির সমুদ্র অভিযানের জয়গান গাওয়া হয় না, বরং আফ্রিকান, ইউরোপীয় এবং আমেরিকার প্রাচীন অধিবাসীদের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা বহুমুখী সংস্কৃতি উদযাপন করা হয়। নাচ, গান, হাজার বছরের প্রাচীন লোকশিল্প আর রংবেরঙের পোশাকের প্রদর্শনীতে মেতে ওঠে পুরো দেশ।

অনলাইন অনুসন্ধানের ঝড় ও আধুনিক বিতর্ক

অক্টোবর মাস ঘনিয়ে আসলেই ইন্টারনেট জগতে হঠাৎ করেই এই বিষয়টি সম্পর্কিত অনুসন্ধানের পারদ হু হু করে বাড়তে থাকে। গুগল সার্চের ট্রেন্ডিং তালিকায় উঠে আসে ইতিহাস, বিতর্ক আর এই বিশেষ দিনটি নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতুহল। একদিকে ইউরোপীয়দের বিজয়ের স্মারক হিসেবে স্মৃতি ধরে রাখার তাগিদ, অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রক্তঝরা অধিকারের লড়াই দুই তরফের এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ অনলাইন দুনিয়াকে উত্তপ্ত করে তোলে। ইতিহাসের সত্যতা জানার এই তাগিদ আজকের বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কোনো একক বর্ণনার ওপর ভর করে একটা ছুটির দিন চিরকাল একই রকম থাকে না। প্রতিটা দেশ তার নিজের মতো করে শিকড় খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে, আর তার সরাসরি প্রতিফলন ঘটছে সার্চ ইঞ্জিনের তথ্য খোঁজার ছন্দে।

পরিশেষে বলা যায়, সেই কাঠের জাহাজের নোঙর ফেলে দেওয়া আর ভুল নামে একটা জাতিকে ডাকার ঐতিহাসিক ভুল আজও থামেনি। তবে সময়ের চাকা ঘুরে আজ বিজয়ের ধ্বনির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে পারস্পরিক সম্মান ও সম্প্রীতির বার্তা। একটা দিন শুধু ইতিহাস মনে করার জন্য নয়, বরং সব বৈচিত্র্যকে বুকে জড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে সামনে আসে। ইতিহাস যাই বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত জয় হোক মানুষের সংস্কৃতি ও ভালোবাসার সমাহারে গড়ে ওঠা আমাদের এই পৃথিবীর!

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর