মাটির প্রায় ২,০০০ ফুট নিচে অন্ধকার এক বন্দিশালা! চারিদিকে উত্তপ্ত বাতাস আর পাথরের স্তূপ। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট চিলির কোপিয়াপো শহরের কাছে সান হোসে কপার ও গোল্ড খনিতে ধস নেমে যখন ৩৩ জন খনি শ্রমিক মাটির নিচে আটকা পড়েন, তখন বিশ্ববাসী ধরে নিয়েছিল তাদের আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু টানা ৬৯ দিনের লড়াই শেষে যখন প্রতিটি মানুষ জীবিত অবস্থায় আলোর মুখ দেখেন, তখন পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়। মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযানটি পরিচিত পায় ‘দ্য মিরাকল অব চিলি’ নামে।
পাতালের অন্ধকার ও প্রথম ১৭ দিনের অদম্য সংগ্রাম
খনি ধসের পর প্রথম ১৭ দিন বাইরের পৃথিবী জানতই না শ্রমিকেরা বেঁচে আছেন কি না। মাটির নিচে মাত্র ৫০ বর্গমিটারের জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে আটকা পড়েছিলেন ৩৩ জন সদস্য। সেখানে তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আর্দ্রতা ছিল ৯০ শতাংশেরও বেশি। খাবারের রসদ ছিল অত্যন্ত সীমিত মাত্র দুই দিনের খাবার দিয়ে তাদের চালাতে হয়েছিল ১৭ দিন! প্রতি ৪৮ ঘণ্টা পরপর তারা খেতেন মাত্র দুই চামচ টুনা মাছ, আধগ্লাস দুধ আর সামান্য একটু বিস্কুট।
লুইস উরজুয়া নামের খনি ম্যানেজারের নেতৃত্বের গুণাবলী ও শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যে থাকা শৃঙ্খলা ও একতা তাদের মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল। ১৭তম দিনে উদ্ধারকারীদের একটি ছোট ড্রিল যখন খনির জরুরি আশ্রয়ের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন শ্রমিকরা তার সাথে লাল কালিতে লেখা একটি ছোট চিরকুট আটকে দেন ‘Estamos bien en el refugio los 33’ (আমরা আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৩ জনই ভালো আছি)। এই একটি বার্তা পুরো চিলি তথা বিশ্বজুড়ে আশার আলো জ্বালিয়ে তোলে।
‘অপারেশন সান লরেঞ্জো’
সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ার পর চিলি সরকার এবং আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল একত্রিত হয়ে শুরু করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘ উদ্ধার অভিযান ‘অপারেশন সান লরেঞ্জো’। পাথরের বুক চিড়ে সেই খনি শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনার নেপথ্যে কাজ করেছিল ত্রিমুখী এক বিস্ময়কর কৌশল অত্যাধুনিক ড্রিলিং প্রযুক্তি, নাসা প্রকৌশলীদের নকশা করা বিশেষ ক্যাপসুল এবং কঠোর মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা। নাসার প্রকৌশলী, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং খনি বিশেষজ্ঞরা তিনটি বড় ড্রিলিং রিগ (প্ল্যান এ, বি এবং সি) ব্যবহার করে মাটির নিচে পথ তৈরির কাজ শুরু করেন।
ত্রিমুখী ড্রিলিং রিগের অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতা
মাটির নিচে আটকে পড়া মানুষগুলোর কাছে পৌঁছানোর জন্য উদ্ধারকর্মীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সুনির্দিষ্ট এবং দ্রুত পথ তৈরি করা। এজন্য একযোগে তিনটি ভিন্ন প্রযুক্তির ড্রিলিং রিগ ব্যবহার করা হয়, যা ইতিহাসে ‘প্ল্যান এ’, ‘প্ল্যান বি’ এবং ‘প্ল্যান সি’ নামে পরিচিত। প্রথম পর্যায়ে ‘প্ল্যান এ’ এর স্ট্রাতা ৯৫০ ড্রিলটি দিয়ে বড় একটি গর্ত করার চেষ্টা করা হয়, যা ধীরগতিতে এগোলেও খনির ভেতরের বায়ু চলাচল স্বাভাবিক করতে সাহায্য করেছিল।
সবচেয়ে বেশি সফলতা দেখায় ‘প্ল্যান বি’-এর শংকর ড্রিল, যা রকিং মেটালের কঠিন স্তর কেটে শ্রমিকদের মূল আশ্রয়ের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য সুনির্দিষ্ট গাইড হোল বা পথ ধরে এগোতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, খনির ওপরের স্তরের বিশাল পাথর কেটে দ্রুত বিকল্প পথ তৈরির জন্য ভারী মেশিন নিয়ে কাজ শুরু করে ‘প্ল্যান সি’-এর টি-১৩০ রিগ। এই ত্রিমুখী ড্রিলিংয়ের বহুমুখী কৌশলের ফলেই মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মাটির নিচে পাথরের পাহাড় ভেদ করে যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
নাসার প্রকৌশলে তৈরি ফিনিক্স ক্যাপসুলের রূপরেখা
ড্রিল দিয়ে ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করা গেলেও প্রায় ৭০০ মিটার গভীর থেকে একজন মানুষকে সুস্থ অবস্থায় ওপরে তুলে আনা ছিল আরেকটি বিরাট প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। এই কাজের জন্য চিলির নৌবাহিনী এবং মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) প্রকৌশলীরা যৌথভাবে ডিজাইন করেন ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত উদ্ধারযান ‘ফিনিক্স (Fénix)’ ক্যাপসুল।
মাত্র ২১ ইঞ্চি বা ৫৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের এই সরু সিলিন্ডার আকৃতির ধাতব ক্যাপসুলটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সংকীর্ণ সুড়ঙ্গের পাথরে কোথাও আটকে না যায়। ক্যাপসুলটির ভেতরে অক্সিজেন ট্যাংক, যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত সাসপেনশন এবং জরুরি লাইটিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এছাড়াও, খনি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা যেন ওপরে ওঠার সময় আকস্মিক বদল না ঘটে, সেজন্য এতে বিশেষ মেডিকেল মনিটরিং টুলস যুক্ত করা হয়েছিল। ধাতব এই ক্যাপসুলটি টানা কয়েক দিন ধরে ২৪ ঘণ্টা পালাবদল করে খনির গভীর থেকে একে একে ৩৩ জন মানুষকে নিরাপদে আলোর দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনে।
মানসিক শক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবস্থাপনা
শারীরিক বেঁচে থাকার লড়াইয়ের চেয়েও খনির ভেতরের অন্ধকার কুঠুরিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৩ জন মানুষের মানসিক স্থৈর্য ধরে রাখা। টানা ১৭ দিন কোনো বাহ্যিক যোগাযোগ না থাকায় খনি শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও মানসিক অবসাদ গ্রাস করতে শুরু করেছিল। এই সংকট উত্তরণে মনস্তাত্ত্বিক এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা এক অভিনব পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।
শ্রমিকদের সুশৃঙ্খল রাখতে অভিজ্ঞ ম্যানেজার লুইস উরজুয়াকে দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং একটি কঠোর রুটিন বেঁধে দেওয়া হয়। প্রতিদিনের খাবার কঠোরভাবে মেপে খাওয়ার পাশাপাশি খনির ভেতর হালকা ব্যায়াম, গান গাওয়া এবং একে অপরকে সাহস জোগানোর পরিবেশ তৈরি করা হয়। অন্যদিকে, ভূপৃষ্ঠে চিলির সরকার মনস্তাত্ত্বিক এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ দল নিয়োগ করে, যারা উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের পরিবারের সাথে নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্স ও চিঠিপত্রের আদান-প্রদান নিশ্চিত করেন। এই মানসিক রসদ এবং পারস্পরিক বিশ্বাসই তাদের ৭০০ মিটার গভীরে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেয়নি।
বাস্তব এই ঘটানাটি আমাদের যে শিক্ষা দেয়
উদ্ধার অভিযানের শেষ মুহূর্তে যখন সর্বশেষ খনি শ্রমিক লুইস উরজুয়া নিরাপদে বাইরে বেরিয়ে আসেন, তখন চিলির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সেবাস্টিয়ান পিনেরা এবং পুরো উদ্ধারকারী দল এক হয়ে চিলির জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে ওঠেন। চিলির সেই ৬৯ দিনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা বিশ্ব খনি শিল্পকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, অন্ধ মুনাফার চেয়ে শ্রমিকের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এই বিপর্যয়ের শিক্ষা থেকেই আজকের আধুনিক খনিগুলোতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে শ্রমিকদের নিরাপত্তা আগের তুলনায় বহুগুণ সুরক্ষিত করা হয়েছে। এটি কেবল প্রকৌশল বিদ্যার জয় ছিল না, বরং মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য এবং ঐক্যের মহাকাব্যিক নিদর্শন হয়ে রয়েছে।