Thursday 05 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মাদক ও কিশোর অপরাধ রুখতে বই হোক বিকল্প

তানজিদ শুভ্র
৫ নভেম্বর ২০২৬ ২০:১১

পত্রিকার পাতা খুললেই কিংবা টেলিভিশনে খবর দেখতে বসলেই ভেসে আসে কিশোর অপরাধের নানা খবরাখবর। প্রতিনিয়ত এ সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। নানাবিধ কারণ থাকতে পারে উঠতি বয়সী এসব কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার। তবে এই সময় কিশোর অপরাধের দৌড়াত্ম থামাতে না পারলে ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

কোনো সন্ধ্যার দৃশ্য কল্পনা করুন। মাঠে খেলার বদলে কয়েকজন কিশোর রাস্তার মোড়ে বসে আছে। কারও হাতে মুঠোফোন, কেউ অকারণে সময় কাটাচ্ছে, আবার কেউ জড়িয়ে পড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্গের সঙ্গে। অথচ একই গ্রামে যদি একটি পাঠাগার থাকত, যেখানে বই পড়ার পাশাপাশি গল্প, বিতর্ক, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকত, তাহলে সেই সন্ধ্যার চিত্র কি কিছুটা বদলাতে পারত না? প্রশ্নটি কেবল পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়, বরং আমাদের কিশোরদের জন্য কী ধরনের সমাজ ও পরিবেশ তৈরি করছি, তা নিয়েও।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন উদ্বেগের বিষয়। অপরাধের পরিসংখ্যান, মাদকাসক্তির ঝুঁকি এবং তরুণদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক সামাজিক উদ্যোগ। গ্রামে গ্রামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা এবং কিশোরদের পাঠাভ্যাসে মনোযোগী করে তোলা হতে পারে সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের যৌথ গবেষণায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার ফল ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। এতে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহার করেন বলে অনুমান করা হয়েছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৩৩ শতাংশ জানিয়েছেন, ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে তাঁদের মাদক গ্রহণ শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, কিশোর বয়সেই মাদকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ঝুঁকি বাস্তব।

অন্যদিকে, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ২৩৭টিতে পৌঁছানোর তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে কিশোর অপরাধীদের জন্য পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্যভান্ডার না থাকায় সুনির্দিষ্ট হালনাগাদ জাতীয় চিত্র পাওয়া কঠিন। এই তথ্যের সীমাবদ্ধতা মনে রেখেই বলা যায়, কিশোর অপরাধকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্নতা, বেকারত্বের আশঙ্কা, অপরাধী চক্রের প্রভাব এবং সমবয়সীদের চাপ তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিতে পারে। কখনো কখনো অপরাধের মাধ্যমে ক্ষমতা, পরিচিতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষাও কাজ করে।

তাই কেবল অপরাধ সংঘটনের পর শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই কিশোরদের জন্য বিকল্প ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

পাঠাগারকে আমরা সাধারণত বই পড়ার জায়গা হিসেবে দেখি। কিন্তু আধুনিক পাঠাগারের ধারণা আরও বিস্তৃত। এটি হতে পারে একটি গ্রামের জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সংযোগের কেন্দ্র।

একজন কিশোর যখন পাঠাগারে যায়, তখন সে শুধু বই পড়ে না। সেখানে তার নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়, নিজের আগ্রহ আবিষ্কারের সুযোগ তৈরি হয়। নিয়মিত পাঠাভ্যাস তার ভাষাগত দক্ষতা, চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণাও আনন্দের জন্য পাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিয়মিত স্বেচ্ছাপাঠ শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা, শেখার আগ্রহ এবং সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত।

এখানেই পাঠাগারের সামাজিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এটি কিশোরদের অবসর কাটানোর একটি অর্থবহ বিকল্প তৈরি করে। যেখানে অপরাধী চক্র তরুণদের নিজেদের দলে টানতে চায়, সেখানে পাঠাগার তাদের জ্ঞান, বন্ধুত্ব ও সৃজনশীলতার একটি ইতিবাচক পরিসর দিতে পারে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৪ সালের যৌথ বিশেষজ্ঞ বিবৃতিতে কিশোরদের মাদক প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজভিত্তিক উদ্যোগের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিশোরদের শুধু প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী নয়, বরং উদ্যোগের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। গ্রামীণ পাঠাগার এই বহুমাত্রিক প্রতিরোধব্যবস্থার একটি কার্যকর অংশ হতে পারে।

বর্তমান প্রজন্মের জীবন থেকে মুঠোফোন ও ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। অনলাইন শিক্ষা, তথ্য অনুসন্ধান, যোগাযোগ ও বিনোদনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। সমস্যা প্রযুক্তির উপস্থিতিতে নয়, বরং এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের নির্দেশনায় শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকা, বিশেষ করে অবসর সময়ের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। তবে সংস্থাটি কিশোরদের জন্য অবসরকালীন স্ক্রিন টাইমের নির্দিষ্ট কোনো সর্বজনীন সময়সীমা নির্ধারণ করেনি। তাই সব ধরনের মুঠোফোন ব্যবহারকে আসক্তি বলা যেমন ভুল, তেমনি অতিরিক্ত ব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষতিও উপেক্ষা করা যায় না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২০০ শিক্ষার্থীসহ মোট ৩১০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীকে মুঠোফোন ব্যবহারে আসক্তির লক্ষণযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাঠাগার ব্যবহারে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছে।

এই বাস্তবতায় পাঠাগার হতে পারে প্রযুক্তির বিকল্প নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার শেখানোর জায়গা। সেখানে বই পড়ার পাশাপাশি ডিজিটাল পাঠ, অনলাইন তথ্য যাচাই, শিক্ষামূলক ভিডিও এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার শেখানো যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে আধুনিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু ভবন নির্মাণ কিংবা বই কিনে তাক সাজিয়ে রাখলেই পাঠাগার কার্যকর হবে না। প্রয়োজন পাঠকবান্ধব পরিবেশ, নিয়মিত কার্যক্রম এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গ্রামভিত্তিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। অব্যবহৃত সরকারি কক্ষ, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত জায়গা এ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। পাঠাগারে শিশু-কিশোরদের উপযোগী গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী, কৃষি, প্রযুক্তি ও সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক বই রাখতে হবে। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বইয়ের সংগ্রহও জরুরি।

এছাড়া পাঠাগারকে প্রাণবন্ত করতে নিয়মিত বইপড়া প্রতিযোগিতা, গল্প বলা, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, কুইজ, কবিতা পাঠ, চিত্রাঙ্কন এবং লেখালেখির কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে। স্থানীয় শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করা গেলে এসব কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। পাশাপাশি পাঠাগার পরিচালনায় কিশোরদেরও দায়িত্ব দিতে হবে। বই নির্বাচন, অনুষ্ঠান আয়োজন, পাঠচক্র পরিচালনা কিংবা পাঠাগারের পরিচর্যায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর প্রতি আগ্রহ ও দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।

মাদক প্রতিরোধে পাঠাগারের সঙ্গে পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় প্রশাসনের সংযোগ স্থাপন করতে হবে। মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের অপমান বা বিচ্ছিন্ন না করে প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রবাসী, ব্যবসায়ী এবং সামাজিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে পারে। বই সংগ্রহের জন্য বইদান কর্মসূচি, পাঠাগার পরিচালনায় স্বেচ্ছাসেবক দল এবং স্থানীয়ভাবে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত মূল্যায়ন। কতজন কিশোর পাঠাগারে আসছে, কতটি পাঠচক্র হচ্ছে, কতজন স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাসে কী পরিবর্তন আসছে, এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা জরুরি।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, পাঠাগার মাদক ব্যবসা, অপরাধী চক্র কিংবা সামাজিক বৈষম্যের বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা সমানভাবে প্রয়োজন।

কিশোরদের জন্য একটি বইয়ের তাক হয়তো এক দিনে সমাজ বদলে দিতে পারবে না। কিন্তু একটি বই নতুন চিন্তার দরজা খুলতে পারে, একটি পাঠচক্র নতুন বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারে, একটি পাঠাগার একজন কিশোরকে জীবনের বিকল্প পথ দেখাতে পারে। সামাজিক পরিবর্তন প্রায়ই এমন ছোট উদ্যোগ থেকেই শুরু হয়।

আমরা যদি মাদকমুক্ত, অপরাধমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে কিশোরদের শুধু নিষেধের ভাষায় নয়, সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলতে হবে। তাদের হাতে বই তুলে দিতে হবে, ভাবার সুযোগ দিতে হবে, নিজেদের মতো করে বড় হওয়ার নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে।

মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের অভিযান কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এই লড়াই হতে হবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ। গ্রামে গ্রামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা সেই উদ্যোগের একটি বাস্তব, মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর