ভোরের আলো ফুটতেই শহরের বাতাসে লাল-সাদা রঙের উচ্ছ্বাস। পান্তা-ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, রবীন্দ্রসঙ্গীত সবকিছুর মাঝেও এক নীরব অথচ গভীর শিল্পচর্চা চোখে পড়ে: নারীদের গালে আঁকা আলপনা। ছোট্ট তুলি, সামান্য রঙ, আর এক চিলতে মুখ, এই তিনেই যেন ফুটে ওঠে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি।
আলপনা শুধু নকশা নয়; এটি এক ধরনের ভাষা। গ্রামবাংলার উঠোনে চালের গুঁড়ার সাদা রঙে যে আলপনা আঁকা হতো, তারই আধুনিক রূপ এখন শহরের রাস্তায়, মানুষের মুখে। বৈশাখ এলে সেই ঐতিহ্য গালভরা হাসির সঙ্গে মিশে যায়। নারীরা যেন নিজের মুখকেই বানিয়ে তোলেন উৎসবের ক্যানভাস।
এই আলপনার নকশায় থাকে শঙ্খ, সূর্য, পাখি, ফুল কিংবা জ্যামিতিক রেখা যার প্রতিটিই বহন করে আলাদা অর্থ। সূর্য মানে নতুন সূচনা, ফুল মানে সৌন্দর্য ও প্রস্ফুটন, আর পাখি যেন মুক্তির প্রতীক। গালে আঁকা ছোট্ট একটি নকশাও তাই হয়ে ওঠে জীবনের প্রতি আশাবাদের প্রকাশ।
রঙের ব্যবহারেও থাকে বৈশাখের নিজস্ব ছন্দ। লাল-শক্তি, সাহস আর ভালোবাসার প্রতীক; সাদা-শান্তি ও পবিত্রতার। এই দুই রঙের মিশ্রণে তৈরি হয় এক অপূর্ব বৈপরীত্য, যা বাঙালির মনোজগৎকে প্রতিফলিত করে। কখনও তার সঙ্গে যোগ হয় সবুজ বা হলুদের আভা, যেন প্রকৃতির স্পর্শও এসে লাগে মানুষের মুখে।
রাস্তার পাশে বসা শিল্পীরা নিঃশব্দে কাজ করে যান। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ পেশাদার, আবার কেউ শুধুই ভালোবাসা থেকে আঁকেন। তাদের হাতে আঁকা আলপনা যেন মুহূর্তেই বদলে দেয় একজন মানুষের অভিব্যক্তি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ একটু লজ্জা পান, কেউ বা গর্বের হাসিতে ভরে ওঠেন এই ছোট্ট শিল্পই তাদের বৈশাখকে পূর্ণ করে তোলে।
বৈশাখে আলপনা আঁকা যেন নারীদের জন্য এক বিশেষ আনন্দের অংশ। এটি সাজের একটি উপাদান হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আত্মপরিচয়ের প্রকাশ।
আধুনিকতার ভিড়ে দাঁড়িয়েও তারা যেন বলতে চান ‘আমি বাঙালি, আমার শেকড় এই মাটিতেই।’ দিন শেষে রঙ মুছে যাবে, নকশা মিলিয়ে যাবে। কিন্তু সেই মুহূর্তের হাসি, সেই অনুভব তা থেকে যাবে মনে।
তাই বৈশাখের ভিড়ে, রঙের উৎসবে, সবার মাঝে আলাদা করে নজর কাড়ে এই গালের আলপনা। এটি শুধু সাজ নয়, এAটি সংস্কৃতি, এটি পরিচয়, এটি উৎসবের হৃদস্পন্দন যা প্রতি বছর নতুন করে আমাদের বাঙালি হয়ে ওঠার গল্প।