অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছে ট্রেকিং এক অন্যরকম নেশা। ঝিরিপথ, পাহাড় আর অরণ্যের মায়াবী টানে এবং শহরের কোলাহল থেকে দূরে হারিয়ে যেতে ভ্রমণপিয়াসী মানুষ ছুটে যায় দুর্গম প্রকৃতির বুকে। তবে সাধারণ ভ্রমণের চেয়ে ট্রেকিং অনেকটাই আলাদা, দুঃসাহসিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু এসব পাহাড়ি বা বুনো এলাকায় হুট করে কোনো সাহায্য, দোকানপাট কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না, তাই সঠিক পরিকল্পনা ও পূর্ব প্রস্তুতি না থাকলে যেকোনো ছোট ভুলও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
ট্রেকিংয়ের আনন্দকে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন করতে নতুন ও অভিজ্ঞ উভয় ট্রেকারদের জন্য জরুরি পূর্ব প্রস্তুতি নিচে তুলে ধরা হলো…
শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস
ট্রেকিংয়ের প্রধান শর্ত হলো স্ট্যামিনা বা শারীরিক সক্ষমতা। পাহাড় চড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার অন্তত এক মাস আগে থেকে নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা এবং পায়ের শক্তি বাড়ানোর ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ শুরু করুন। হার্ট, ফুসফুস বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, আপনি ফিট না হলে যাত্রাপথে পুরো দল বিপদে পড়বে। (অ্যাজমা, জয়েন্ট পেইন বা হাই ফোবিয়া থাকলে পাহাড়ি ট্রেকিং এড়িয়ে চলাই ভালো)।
সঠিক ব্যাকপ্যাক বা ব্যাগ নির্বাচন
ট্রেকিংয়ের জন্য এমন ব্যাগ বেছে নিন যেটিতে মাল্টিপল বেল্ট বা ফিতা রয়েছে। ফিতা বেশি থাকলে ব্যাগের ওজন পুরো শরীরে সমানভাবে ভাগ হয়ে যায়, ফলে কাঁধের ওপর চাপ কম পড়ে এবং হাঁটতে সুবিধা হয়। ব্যাগে পকেট বা চেম্বার বেশি থাকলে প্রয়োজনীয় জিনিস আলাদা রাখা সহজ হয়। মনে রাখবেন, আপনার ব্যাগ যত হালকা হবে, আপনার হাঁটা তত স্বচ্ছন্দ হবে।
ট্রাভেল ফ্রেন্ডলি পোশাক
ভারী কাপড়ের বদলে হালকা রঙের সুতি বা ঝটপট শুকিয়ে যায় (ড্রাই-ফিট) এমন স্পোর্টস ট্রাউজার, টি-শার্ট ও ফুল স্লিভ গেঞ্জি বেছে নিন। এগুলো রোদ ও মশা-পোকামাকড় থেকে বাঁচাবে। সাথে অবশ্যই একটি গামছা বা পাতলা তোয়ালে রাখুন। স্থান ও ঋতুভেদে পোশাকের সংখ্যা নির্ধারণ করুন।
গ্রিপযুক্ত জুতা
পাহাড়ি, কাদা বা পিচ্ছিল রাস্তায় হাঁটার জন্য ভালো ‘অ্যাঙ্কেল সাপোর্ট’ এবং দারুণ গ্রিপযুক্ত ট্রেইল রানিং শু বা ট্রেকিং বুট ব্যবহার করুন। ক্যাম্পিং বা বিশ্রামের সময়ের জন্য ব্যাগে এক জোড়া হালকা স্যান্ডেলও রাখতে পারেন।
এনার্জি বুস্টার শুকনো খাবার
সহজে হজম হয় এবং দ্রুত শক্তি দেয় এমন খাবার সাথে রাখুন। যেমন: খেজুর, বাদাম, চকলেট, ওটস বার, কিশমিশ, চিঁড়ে ও গুড়। পানিতে মিশিয়ে খাওয়ার জন্য খাবার স্যালাইন ও গ্লুকোজ নেওয়া বাধ্যতামূলক। পাহাড়ে নিজে রান্না করতে চাইলে ছোট ক্যাম্পিং স্টোভ ও ইনস্ট্যান্ট নুডলস বা স্যুপের প্যাকেট নিতে পারেন।
মিনি ফার্স্ট এইড বক্স
জরুরি চিকিৎসার জন্য একটি ছোট বক্সে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, ব্যান্ডেজ, পেইনকিলার, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ এবং মশা তাড়ানোর ওডোমস ক্রিম গুছিয়ে নিন। জোঁকের উপদ্রব আছে এমন রুটে যাওয়ার সময় সাথে অবশ্যই পর্যাপ্ত লবণ বা সরিষার তেল রাখুন।
অন্যান্য স্মার্ট গ্যাজেট ও ট্রাভেল কিটস
কানেক্টিভিটি ও নেভিগেশন: দুর্গম এলাকায় জিপিএস বা ফোনের নেটওয়ার্ক কাজ নাও করতে পারে। তাই অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে রাখুন এবং পেপার ম্যাপ ও কম্পাস ব্যবহারের প্রাথমিক ধারণা নিয়ে নিন।
টুলস ও লাইট: রাতে পথ চলার জন্য হেডল্যাম্প বা শক্তিশালী টর্চলাইট, পাওয়ার ব্যাংক এবং অতিরিক্ত ব্যাটারি সাথে রাখুন।
ক্যাম্পিং গিয়ার: রাতে তাঁবুতে থাকার পরিকল্পনা থাকলে ওয়াটারপ্রুফ তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ এবং রশি সাথে নিন।
সুরক্ষা ও টয়লেট্রিজ: রোদ থেকে বাঁচতে সানগ্লাস, হ্যাট এবং হাঁটার সুবিধার্থে ‘ট্রেকিং স্টিক’ অত্যন্ত কার্যকরী। ফোন ও ক্যামেরা সুরক্ষায় জিপলক ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ ব্যবহার করুন। এছাড়া ব্রাশ, পেস্ট, মিনি সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও টিস্যু সাথে রাখুন।
কিছু প্রয়োজনীয় সতর্কতা
ট্যুরে যাওয়ার আগে সেখানকার বর্তমান আবহাওয়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে খোঁজখবর নিন। দলে অভিজ্ঞ কেউ না থাকলে অবশ্যই একজন বিশ্বস্ত ও স্থানীয় গাইড ভাড়া করুন। সঙ্গী হিসেবে এমন মানুষদের বেছে নিন যাদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ও সহযোগিতার মনোভাব রয়েছে।
প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ব: অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির ক্ষতি পরিহার করুন। চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট বা প্লাস্টিকের বোতল যেখানে-সেখানে না ফেলে ব্যাগে জমিয়ে রাখুন এবং লোকালয়ে এসে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলুন। নিখাদ প্রকৃতিকে পরিচ্ছন্ন রাখাই একজন প্রকৃত ট্রাভেলারের পরিচয়।