Saturday 30 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঈদের অজুহাতে তালাবদ্ধ রমেক কিডনি ওয়ার্ড!

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩০ মে ২০২৬ ২২:১১

ঈদের অজুহাতে তালাবদ্ধ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি ওয়ার্ড। ছবি: সারাবাংলা

রংপুর: ঈদ মানে আনন্দ, আত্মীয়তার মিলন। কিন্তু রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঈদ উদযাপন পেয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ। অসুস্থ রোগীরা যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা যখন সেকেন্ডের ব্যবধানে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই হাসপাতালের একটি কিডনি ওয়ার্ড তালাবদ্ধ করে চিকিৎসক-নার্সরা চলে গেছেন বাড়ি। শুধু তাই নয়, ওয়ার্ড খোলার পরের ঘটনাও কম চাঞ্চল্যকর নয়— খোলার পরও পূর্ণ সেবা কার্যক্রম চালু হচ্ছে না, রোগী ভর্তি নেওয়া নিয়ে রয়েছে জটিলতা।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দোতলায় অবস্থিত ৪০ নম্বর নেফ্রোলজি (কিডনি) ওয়ার্ডের সামনে এখন শুধুই অপেক্ষা। ঈদের ছুটি শেষে কখন আসবে চিকিৎসক-নার্স। শনিবার (৩০ মে) সকাল ১০টার দিকে সেবাপ্রত্যাশী গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর বাসিন্দা মঞ্জু সরকার এসে দেখেন এক নীরব মানবেতিহাসের দৃশ্য। ওয়ার্ডের প্রধান গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কাঁচের দরজার ওপাশ থেকে এক নার্স ইশারায় তাকে জানান, কোনো রোগী নেই, ওয়ার্ড বন্ধ করে দিয়েছেন ‘বড় স্যাররা’।

বিজ্ঞাপন

মঞ্জু সরকার সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে জানান, জানালা দিয়ে উঁকি দিলে দেখা যায়, সব কটি বেড ফাঁকা। যেন কোনো মর্গ, অথচ এটি একটি সক্রিয় হাসপাতাল ওয়ার্ড।

সূত্র জানায়, ঈদের আগের দিন বুধবার থেকে শুরু করে টানা চার দিন এভাবেই এই ওয়ার্ড বন্ধ রাখা হয়। অভিযোগ, এর ফলে রংপুর ও আশপাশের জেলা থেকে আসা কিডনি রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

ওয়ার্ডের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২৫ মে পর্যন্ত ওই ওয়ার্ডে ১৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। কিন্তু ঈদ উদযাপনের অজুহাতে তাদের ‘বাধ্যতামূলক ছুটি’ দিয়ে ওয়ার্ড খালি করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, ১ জুনের আগে কোনো নতুন রোগী ভর্তি নেওয়ার জন্য মৌখিকভাবে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়। শনিবার কিডনি ওয়ার্ড খোলা হলেও পরিস্থিতি বদলায়নি। ওয়ার্ডে এখনও ‘নতুন রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না’ বলে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যাদের ভর্তির প্রয়োজন, তাদের সরাসরি অন্যান্য ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হচ্ছে না।

ভিন্ন চিত্র ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে

ঘটনার আরেক দিক হলো, একই হাসপাতালের পাশেই ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড। সেখানে ঈদের দিন (বৃহস্পতিবার) থেকেই নিয়মিত কার্যক্রম চালু ছিল। শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন তিন শিফটে ৬২ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ঈদের দিনও ৬২ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের এক নার্স জানান, ঈদের দিনও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে রোগী ও স্বজনদের আগেই জানানো হয়েছিল।

একই হাসপাতালে দুটি ওয়ার্ডের এমন বৈপরীত্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ডায়ালাইসিসের মতো জরুরি সেবা চালু রাখা গেলেও কেন কিডনি ওয়ার্ডের ভর্তি রোগীদের ‘ছুটি’ দেওয়া হলো? এ বিষয়ে কিডনি ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধানসহ কোনো চিকিৎসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি ঘটনার দিন। পরে হাসপাতালের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক ডা. আব্দুল মোকাদ্দেমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথমে বিষয়টি জানেন না বলে জানান, পরে খবর নিয়ে দেখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে সেবাপ্রত্যাশীদের প্রশ্ন, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার সঙ্গে ছুটির সম্পর্ক কোথায়? এক রোগীর স্বজন রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘বড়লোক রোগীরা কি প্রাইভেট হাসপাতালে চলে যাবেন? আমরা গরিব মানুষ সরকারি হাসপাতালেই ভরসা করি। ওয়ার্ড তালা দিয়ে তারা আমাদের সঙ্গে কী করলেন?’

শুধু কিডনি ওয়ার্ড বন্ধই নয়, এর প্রভাব পড়েছে রোগী ভর্তি প্রক্রিয়াতেও। সরেজমিনে জানা যায়, কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীরা বাধ্য হয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, যা তাদের সামর্থ্যের বাইরে। গাইবান্ধা থেকে আসা রোগী রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি ভর্তি হতে এসে তালাবদ্ধ ওয়ার্ড দেখে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছি। যদিও সেখানে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমাদের নেই।’

হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষারত এক সেবা প্রত্যাশী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ঠাকুরগাঁও’র বাসিন্দা মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, “রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের এই ঘটনা শুধু একটি ওয়ার্ড বন্ধের গল্প নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর এক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে ডাক্তারদের জন্য ঈদ মানে রোগীদের ‘ছুটি’ দেওয়া, আর রোগীদের জন্য ঈদ মানে হয়ে ওঠে হাসপাতালের সেবা থেকে ছিটকে পড়ার মানসিক যন্ত্রণা।”

প্রশ্ন থেকেই যায়—হাসপাতালে ছুটি বলে কি কিছু হয়? অসুস্থতা কি ছুটির দিন জানে? নাকি এই ‘ছুটি’ শুধুই অসহায় রোগীদের জন্য?

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর