চট্টগ্রাম: উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ৩৬টি খাল পুনঃখনন ও সংস্কার কাজ শেষ হলে প্রকল্পের অধীন খালগুলো সংরক্ষণ এবং প্রকল্পের বাইরে থাকা বাকী খালগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পুনঃখনন ও সংস্কার করার জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
এক্ষেত্রে খাল সংলগ্ন এলাকাগুলোকে সৌন্দর্যবর্ধন করে পর্যটনস্পট গড়ে তোলার বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলেও জানান মেয়র।
বুধবার (১০ জুন) চসিক সম্মেলন কক্ষে কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান আওয়ার পালস পয়েন্টের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন।
তারা ৩৬টি খাল পুনঃখনন ও সংস্কার কাজ শেষ হলে প্রকল্পের অধীন খালগুলো কিভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং প্রকল্পের বাইরে থাকা বাকী খালগুলো কিভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং খনন করা হবে সে বিষয়ে রূপরেখা তুলে ধরেন। তারা স্মার্ট ড্রেইনেজ নামের একটি অনলাইন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা জানান যাতে জলাবদ্ধতার বিষয়ে জনগণ সরাসরি ছবি তুলে অভিযোগ ও পরামর্শ জানাতে পারবে।
এতে বক্তব্য দেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) ফরহাদুল আলম মোহাম্মদ শাহীন-উল ইসলাম চৌধুরী, জসিম উদ্দিন, আবু সাদাত তৈয়ব, মেয়রের জলাবদ্ধতা বিষয়ক উপদেষ্টা শাহরিয়ার খালেদ, কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি, ডা. এস এম সারোয়ার আলম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রতিষ্ঠানটির উপস্থাপিত ৫ বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে নগরীর ৩৬টি খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা নিরূপণ করা হবে। এসব খাল থেকে প্রায় ১৬ লাখ ঘনমিটার পলি ও বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান খালগুলোকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।
পরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপে (১-৬ মাস) জরুরি ভিত্তিতে খাল থেকে পলি ও বর্জ্য অপসারণ এবং খালসমূহের ডিজিটাল ইনভেন্টরি প্রস্তুত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে (৬-২৪ মাস) খালের কাঠামোগত উন্নয়ন, ইউ-ওয়াল নির্মাণ এবং নাগরিক অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। তৃতীয় ধাপে ((২-৫ বছর) আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, বন্যা পূর্বাভাস এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সভায় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণের জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন ৩৬টি খাল পুনঃখনন ও সংস্কার প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর খালগুলো যাতে পুনরায় ভরাট বা দখলের শিকার না হয়, সে জন্য কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একইসঙ্গে প্রকল্পের আওতার বাইরে থাকা খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর পুনঃখনন, সংস্কার এবং সংরক্ষণের লক্ষ্যে একটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হচ্ছে।’
মেয়র আরও বলেন, ‘শুধু খাল খনন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খালগুলোকে জীবন্ত ও কার্যকর রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে স্মার্ট ড্রেইনেজ ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। জনগণ সরাসরি ছবি ও তথ্য পাঠিয়ে জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সমস্যা কিংবা খাল দখলের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।’
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরীর খালগুলোকে শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ ও নগর সৌন্দর্যের অংশ হিসেবেও গড়ে তোলা হবে। খালপাড়ে হাঁটার পথ, সবুজায়ন, বসার স্থান এবং বিনোদন সুবিধা সৃষ্টি করে সেগুলোকে পর্যটন ও জনবান্ধব স্থানে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে নাগরিকদের জন্য নতুন উন্মুক্ত স্থান তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। নগরীর প্রতিটি খাল, নালা ও ড্রেনের তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করে একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা হবে।’
মেয়র বলেন, ‘বর্তমান নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জলাবদ্ধতামুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। পরিকল্পিতভাবে খাল সংরক্ষণ, পুনঃখনন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
প্রকল্প বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় জলাবদ্ধতাপ্রবণ বহাদ্দারহাট, চকবাজার, বদুরতলা ও আশপাশের এলাকাগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।