ঢাকা: নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চলে গেছে তিন মাস। আর এই সময়ে দেশে খুন-ধর্ষণ-চুরি-ডাকাতি এমনকি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও বাড়ছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কিত করে তুলছে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা। পরিসংখ্যান বাড়ছে রীতিমত চমকে ওঠার মতো। কোনোভাবেই যেন রোধ করা যাচ্ছে না এসব অপরাধীদের। কোথাও কোথাও পুলিশ প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্তের শিকার হচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও অনেকটা নির্বিকার।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় ফুটে উঠছে, দেশে যেন হত্যা-ধর্ষণ ও সন্ত্রাসের মতো কিছুই ঘটেনি, বা ঘটছে না। তার কথায় মনে হয়, তিনি কিছুই জানেন না ও বোঝেন না। তিনি শুধু অভিযান চালানোর কথা বলেই শেষ করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় অস্থিরতা বেড়েছে। অচিরেই এসব বন্ধ করা না গেলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে সাধারণ মানুষকে।
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর মাথা বিচ্ছিন্ন করা হত্যাকাণ্ডটি আগুনের মধ্যে যেন ঘি ঢেলে দেয় অপরাধীরা। প্রায় কাছাকাছি সময়ে সিলেট, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, যাত্রাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লাসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটে। এতে দেশবাসী ফুঁসে ওঠে। তারা হত্যার বিচার চেয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সরব হয়ে উঠেছে।
দেশবাসীর দাবি, দেশে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রতিকার হিসেবে বিচার না হওয়ায় এবং বিচারে দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে এসব অপকর্ম দেশে বেড়েই চলেছে। তাই ন্যূনতম সময়ের মধ্যে ধর্ষণের মতো ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় দেশবাসী। আবার এসব অপরাধ ঠেকাতে গিয়ে পুলিশ নিজেই হামলার শিকার হচ্ছেন কোথাও কোথাও। ফলে পুলিশ সদস্যরাও খুব বেশি ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০২৫ সালে ৬২২ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। তার কোনো প্রতিকার আজও মেলেনি। পুলিশ সদর দফতরের হিসাব মতে, এ বছর জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্ন্ত সারাদেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এক হাজার ১৪২টি। একই সময়ে নারী ও শিশু নিপীড়নের ঘটনা ঘটে ৫ হাজার ৯৫৮টি। এ সময় ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ১৮৪টি। আর অপহরণের শিকার হয়েছেন ৩৪৭ জন। চুরির ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ৯৯টি। এর বাইরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন ২১৩ জন পুলিশ সদস্য।
পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১২ মাসে সারাদেশে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ৭৮৬টি, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৪৪২টি। আর ২০২৩ সালে ছিল ৩ হাজার ২৩টি। মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে ৫২২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অনেক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
আছিয়া থেকে রামিসা কত না শিশুকে নরপিশাচদের হাতে বলি হতে হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনসহ আইনের সঠিক ও কঠিন প্রয়োগকেই একমাত্র সমাধান দেখছে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উম্মে ওয়ারা সারাবাংলাকে বলেন, ‘অপরাধীদের শাস্তি হলে এর প্রভাবে অন্যান্য অপরাধীদের ওপরও পড়ে। শাস্তির ধরণ দেখে তারা অপরাধ করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। শাস্তি না হলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আর যদি দীর্ঘ সময় ধরে কোনো শাস্তি না দেখে থাকে, তাহলে একই অপরাধ সমাজে বারবার ঘটতেই থাকে। এখন সময় এসেছে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। রাষ্ট্র সেটি করতে ব্যর্থ হলে সমাজে নতুন অপরাধী এমনিতেই তৈরি হয়ে যাবে। তখন বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।’
পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি গোলাম রসুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘অপরাধ ও অপরাধীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্বাধীন করে দিতে হবে। এদেশে সেটি কখনো হয়ে ওঠেনি। এখন তো নতুন ট্রেন্ডে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। পুলিশ চেষ্টা করছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে। আবার পুলিশ সকল অপরাধীকে গ্রেফতারে সক্ষম হচ্ছে। এতেই পুলিশের কাজ শেষ। কিন্তু আদালতে গিয়ে সেটির দীর্ঘসূত্রিতা হচ্ছে, অথবা আসামি জামিনে বের হচ্ছে, অথবা খালাস পাচ্ছে। এতে ওই অপরাধীরা নতুন করে অপরাধ করতে কার্পণ্য করছে না। প্রতিটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশ কিন্তু অপরাধীকে গ্রেফতার করে আদালতে তুলছে। এখন যদি তারা সহজেই জামিনে মুক্ত পান তাহলে তো সমাজে একই অপরাধ বারবার সংঘটিত হবে।’
এক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, ‘আদালত বিচার করবে, শাস্তি দেবে। এতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার উপায় নেই। আর দ্বিতীয়ত, অপরাধীর পক্ষে আইনজীবী নিযুক্ত হবে, তবে তা যেন অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য না হয়। জাস্ট আইনি লড়াইয়ের জন্য দাঁড়াবেন আইনজীবীরা। আইনের কাছে অপরাধী শাস্তি পেলে আইনজীবীর কী করার আছে। তবে আমাদের দেশে অনেক আইনজীবী আছেন, যারা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বিচারককেও অনেক সময় প্রভাবিত করে, অপরাধীকে মুক্ত করার দায়িত্ব নিয়ে নেন। এতে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’
জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি মিডিয়া) এস এম নাসির উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাজধানীতে যেক’টি হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রত্যেকটিই শনাক্ত করা হয়েছে। আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কেউ রিমান্ডে আছেন, আবার কেউ জেল-হাজতে। রামিসা হত্যার মামলাটির দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পুলিশের আর কোনো কাজ নেই। এর পর আদালতে বিচারকাজ সম্পন্ন হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীতে ছিনতাই হচ্ছে অনেক। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায়। প্রতিটি ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠাচ্ছে পুলিশ। কিন্তু তারা জামিনে বেরিয়ে একই কাজ করছে। এমনকি ওই অপরাধীরা পুলিশের ওপরও হামলা করতে দ্বিধা করছে না।’
ডিসি মিডিয়া বলেন, ‘তিনি এদেশটা সবার। তাই সবাইকে সমাজের অপরাধ মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে।’