Saturday 19 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাত / জ্বালানি সংকটে দেশ, রাজপথে বিরোধী জোট

মো. মহসিন হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:১৪

জ্বালানি সংকটে দেশ, রাজপথে বিরোধী জোট। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকট— দুই দিকের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে নতুন সরকার। এর মধ্যেই গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের সংকটকে সামনে রেখে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ফলে অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক চাপ।

গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চের কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী জোট। এরপর খুলনা ও সিলেটমুখী কর্মসূচির ঘোষণাও এসেছে। বিরোধী জোটের আট দফার মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার সংকট নিরসনের বিষয়টিও রয়েছে। জোটের নেতারা বলছেন, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে জনগণের দাবির জবাবদিহির মধ্যে আনা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে সরকার বলছে, বর্তমান জ্বালানি সংকটের বড় কারণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং এলএনজি সরবরাহে ধাক্কা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মসূচির বদলে সংসদে বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

যুদ্ধের ধাক্কায় জ্বালানি বাজার

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের শুরুটা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরণের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে।

চলতি বছরের জুলাই-মে সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৯৩ শতাংশ এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য, তেল ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৮৪ শতাংশ।

এরই মধ্যে সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে জ্বালানির দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। বর্তমানে সেপ্টেম্বর মাসে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পুরো চাপ ভোক্তার ওপর না দিয়ে দীর্ঘ সময় সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে তা সামাল দিতে হয়েছে। জুনে সংসদে দেওয়া তথ্যে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রায় ১৭ হাজার ৩৯ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের একদিকে সরবরাহের চাপ, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক চাপ—দুই সমস্যাই একসঙ্গে বাড়ছে।

এলএনজিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা

বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের গ্যাসের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। আর দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমেই বেড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই নির্ভরতাকেই বড় ঝুঁকিতে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পাঁচটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি ‘ফোর্স মেজর’-এর আওতায় পড়েছিল এবং স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ২৪ থেকে ২৮ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউতে উঠে যায়।

পরিস্থিতি সেপ্টেম্বরেও স্বাভাবিক হয়নি। বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে প্রায় ৩০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। সম্প্রতি দুটি কার্গো প্রায় ২৯ দশমিক ৮ ও ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার দরে অনুমোদন করা হয়েছে। প্রতিটি কার্গোর দাম প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি। ফলে গ্যাসের সংকট মেটাতে যত বেশি এলএনজি কিনতে হচ্ছে, সরকারের আর্থিক দায়ও তত বাড়ছে।

গ্যাস আছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রও আছে—নেই পর্যাপ্ত জ্বালানি

বর্তমান সংকটের একটি বড় বৈপরীত্য এখানেই। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। নতুন এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সংকটের সময় সরবরাহ নেমে প্রায় অর্ধেকে চলে এসেছিল। জুলাই-আগস্টে গ্যাস সরবরাহ ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায় এবং এক পর্যায়ে দৈনিক লোডশেডিং ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।

এর প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে নয়—শিল্পেও পড়েছে। গ্যাসের অভাবে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগস্টে প্রায় ৯০০টি টেক্সটাইল মিল উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল বা কার্যক্রম স্থগিত করেছিল। অর্থাৎ সরকারকে একই সঙ্গে তিনটি জায়গায় চাপ সামলাতে হচ্ছে—বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের গ্যাস সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জ্বালানি চাহিদা।

সংকটের সময়েই রাজপথে লংমার্চ

ঠিক এই সময়টাকেই রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য বেছে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে বিরোধী জোটের নেতারা গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকটের কথা তুলে ধরেন। জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আজাদ পরে দাবি করেন, লংমার্চের কারণে সরকার চাপ অনুভব করছে। ১৩ সেপ্টেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার সংকটসহ আট দফা দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চেও জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারের সংকট অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে ছিল।

এখানেই রাজনৈতিক হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক সংকট যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তখন বিরোধীদলের জন্য সেই সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার সুযোগ তৈরি হয়।

সরকারের পালটা যুক্তি

তবে সংকটের দায় পুরোপুরি বর্তমান সরকারের ওপর চাপানোর বিষয়টি সরকার মেনে নিচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি আমদানিতে বড় ধরণের ধাক্কা এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বিরোধী দলের লংমার্চের সমালোচনা করে বলেছেন, বর্তমান সংকটকে কয়েক মাসের সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়; তার ভাষ্য, সমস্যাগুলোর বড় অংশ দীর্ঘদিনের।

সরকারের এই বক্তব্যের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে, এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। জুনে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে।

সংকট কি রাজনৈতিক চাপকে আরও বাড়াবে?

এখন মূল প্রশ্ন—জ্বালানি সংকট কতটা দ্রুত সামাল দিতে পারবে সরকার? কারণ, সংকটের সময়কাল যত দীর্ঘ হবে, এর রাজনৈতিক প্রভাবও তত বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ না থাকা, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা জ্বালানির বাড়তি ব্যয়—এসব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়।

বিশেষ করে ঢাকার তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব বেশি পড়েছে বলে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। সংকটের সময় প্রায় ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এলাকায় জাতীয় ঘাটতির বড় অংশের লোডশেডিং হয়েছে। এ কারণেই জ্বালানি সংকট এখন শুধু অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

সামনে সরকারের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে মূলত দুটি চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও পর্যাপ্ত তেল ও এলএনজি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, এই সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাতে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।

অন্যদিকে বিরোধী জোটের সামনে রয়েছে ধারাবাহিক আন্দোলনকে কতটা জনসম্পৃক্ত রাখা যায় সেই প্রশ্ন। এরই মধ্যে ৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চ-এর পর পরবর্তী কর্মসূচির কথাও জানানো হয়েছে। ফলে সামনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে‘জ্বালানি সংকট বনাম সরকারের সক্ষমতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কবে শেষ হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কখন স্থিতিশীল হবে—তা বাংলাদেশের সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু সংকটের মধ্যে সরবরাহ কতটা নিশ্চিত করা যায়, শিল্পকে কতটা সচল রাখা যায় এবং জনগণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়—সেটিই এখন সরকারের কার্যকারিতার বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।

বিজ্ঞাপন

অপ্রতিম হত্যা, সন্দেহভাজন ৩ জন আটক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৫২

আরো

সম্পর্কিত খবর