ওয়াশিংটনে চলমান আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার একটিই আলোচনা; ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি। আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে এক সাম্প্রতিক আলোচনার ভিত্তিতে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে।
রণক্ষেত্রে সরাসরি সংঘাত বর্তমানে কিছুটা স্তিমিত মনে হলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এই যুদ্ধের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে যুদ্ধবিরতি কতদিন স্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্য আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে কি না তার ওপর। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আজই প্রণালীটি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানি বন্দরগামী কোনো জাহাজকে তারা চলাচলের অনুমতি দেবে না।
আইএমএফ-এর তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে আইএমএফ তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছে;
স্বাভাবিক পরিস্থিতি: এ বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.১ শতাংশ হতে পারে (আগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩.৩%) এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪.৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
প্রতিকূল পরিস্থিতি : যদি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং জ্বালানির দাম বাড়তেই থাকে, তবে প্রবৃদ্ধি ২.৫ শতাংশে নেমে আসবে এবং মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশ ছাড়াবে।
চরম বিপর্যয় : যদি সংকট আগামী বছর পর্যন্ত গড়ায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে এবং প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশে নেমে আসবে।
ক্ষতির অসম বণ্টন
এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মাশুল বিশ্বের সব দেশ একইভাবে দিচ্ছে না। উপসাগরীয় দেশগুলো এবং তেল আমদানিকারক দরিদ্র দেশগুলো (যেমন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপ দেশ এবং সাব-সাহারা আফ্রিকা) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আইএমএফ-এর মতে, যাদের ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা সবচেয়ে কম, তাদের ওপরই এই যুদ্ধের বড় আঘাতটি আসছে।
উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ সুদহারের ঝুঁকি
ধনী দেশগুলোও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপানের বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে সুদের হার উচ্চ রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি মূলত মূল্যস্ফীতির ভয় এবং ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কারণে। এ ছাড়া অনেক উন্নত দেশের সরকারি ঋণ (যেমন কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র) জিডিপি-র ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা ভবিষ্যতের যেকোনো বড় সংকট সামলানোর ক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
এত সংকটের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি এখনো টিকে আছে। এর একটি বড় কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতের বিনিয়োগের জোয়ার। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে এই এআই খাত থেকে। তবে এই সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। যারা যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা এআই-এর এই সুফল থেকে বঞ্চিত।
বিশ্ব অর্থনীতি বারবার নিজেকে স্থিতিস্থাপক প্রমাণ করলেও এখন আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। একের পর এক ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, সুন্দর সময় চিরস্থায়ী নয় এবং সঠিক সময় থাকতেই দেশগুলোর উচিত তাদের আর্থিক সক্ষমতা গুছিয়ে নেওয়া।