প্রায় ১০ সপ্তাহ ধরে ইরানের একটি বন্দরে আটকে আছেন ভারতীয় নাবিক আনিশ। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার কয়েকদিন আগে আনিশ একটি পণ্যবাহী জাহাজে করে শাত আল-আরব জলপথে এসে পৌঁছান।
আল জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় এই নাবিক তার আসল নাম প্রকাশ করতে রাজি না হওয়ায় সংবাদমাধ্যমটি একটি ছদ্মনাম দিয়ে তার কথোপকথনটি প্রকাশ করেছে। আনিশ বলেন, ‘আমরা এখানে যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্রের মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের মন ভীষণ বিক্ষিপ্ত।’
আনিশ আরও জানান, তার কয়েকজন সহকর্মী ভারতীয় নাবিক ইরানের ৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আর্মেনিয়া সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন, কিন্তু আরও অনেকে রয়ে গেছেন কারণ তারা এখনও বেতন পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
জাহাজ সংস্থাগুলোর হয়ে নাবিক নিয়োগ, বেতন ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য কর্মচারী সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করা মধ্যস্থতাকারীদের কথা উল্লেখ করে আনিশ বলেন, ‘কেউ কেউ তাদের ভারতীয় এজেন্টদের কারণে আটকা পড়েছেন কারণ তারা বেতন পাচ্ছেন না। কেউ কেউ আটকা পড়েছেন কারণ ইরানি এজেন্টরা বলছে, আর্মেনিয়ায় পৌঁছানোর জন্য আমরা আপনাদের ডলার দেব না।’
আনিশ বলেন, তিনি আলু, পেঁয়াজ, টমেটো এবং রুটি খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, তিনি এও শুনেছেন যে অন্যান্য জাহাজগুলোতেও খাবার ও পানির সরবরাহ কমে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে আটকা পড়া আনুমানিক ২০,০০০ নাবিকের মতোই আনিশও একই রকম দুর্দশার শিকার হয়েছেন।
যুদ্ধের আগে, এই প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে কাজ করত। যা দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে সার বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হতো।
গত ৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও, জলপথটিতে ও তার আশেপাশে ক্রমাগত হামলার কারণে সামুদ্রিক যান চলাচল স্থবির হয়ে আছে।
যুদ্ধ চলাকালীন অর্থের বিনিময়ে ইরান তার জলসীমা দিয়ে জাহাজগুলোকে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর থেমে থেমে গোলাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে, তেহরানের তেল রফতানি এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তি ব্যাহত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে।

হরমুজ প্রণালিতে নোঙর করা জাহাজের ছবি। এএফপি
যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা লয়েডস লিস্ট সোমবার (৪ মে) জানিয়েছে, আগের দিন থেকে অন্তত চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, ফরাসি সংস্থা সিএমএ সিজিএম পরিচালিত একটি কন্টেইনার জাহাজ বুধবার (৬ মে) জানিয়েছে, জলপথটি অতিক্রম করার সময় সেটি আক্রমণের শিকার হয়েছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) ধারণা অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
ইরানের মার্চেন্ট মেরিন ইউনিয়ন জানিয়েছে, ১ এপ্রিল পর্যন্ত ডককর্মী ও জেলেসহ অন্তত ৪৪ জন ইরানি নাবিক নিহত হয়েছেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিরতির সময় কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালি থেকে বের হতে পারলেও, উপসাগরের বিশাল তেল, গ্যাস ও কন্টেইনার জাহাজের বহরে কর্মরত বেসামরিক নাবিকদের জন্য প্রতিটি দিনই নতুন অনিশ্চয়তা নিয়ে আসছে।
গত মাসে, ইরানি বাহিনী দুটি বিদেশি পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ও তার নাবিকদের আটক করে, অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনী উপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে ইরানের সঙ্গে যুক্ত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করে।
১৫০টি দেশের প্রায় ৭০০টি ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি স্টিফেন কটন বলেন, সমুদ্রে আটকা পড়ার পাশাপাশি আটক হওয়ার আশঙ্কা এক ‘তীব্র ভয়ের পরিস্থিতি’ তৈরি করেছে।
কটন আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটা এক ধরনের পাগলামি, কারণ এরা নাবিক। এরা তো শুধুই শ্রমিক।’
মার্কিন নৌবাহিনীর প্রাক্তন কর্মকর্তা এবং জাপানের ইয়োকোসুকা কাউন্সিল অন এশিয়া-প্যাসিফিক স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক জন ব্র্যাডফোর্ড আল জাজিরাকে বলেন, ‘জাহাজগুলো চলতে না পারায় এবং বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায়, নির্ধারিত বদলির পরেও অনেকের জাহাজে থেকে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না। এর ফলে তারা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছেন। এই ভয়াবহ অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে থাকার পাশাপাশি এটি বড় ধরনের সামাজিক প্রভাবও সৃষ্টি করছে।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সোমবার থেকে প্রণালিটিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে বের করে আনার কাজ শুরু করবে। কিন্তু জলপথে চলমান হামলা সত্ত্বেও শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তিনি এই অভিযান স্থগিত করেন।
জাহাজ চলাচল ও সরবরাহ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালীটি আগামীকাল পুনরায় খুলে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত আঞ্চলিক অবকাঠামো, উপসাগর জুড়ে মজুতাগারগুলোর ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে যাওয়া এবং রফতানি জটের কারণে বাণিজ্য প্রবাহ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।
আটকে পড়া নাবিকদের জন্য প্রণালিটি থেকে বেরিয়ে আসার একটি নিরাপদ পথ খুঁজে বের করার প্রশ্নও রয়েছে। কারণ ইরান সেখানে সমুদ্র মাইন পেতে রেখেছে বলে জানা গেছে।