ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে কোনো অভিন্ন অবস্থানে না পৌঁছেই শুক্রবার (১৫ মে) নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠক শেষ হয়েছে। জোটের ফলাফল দলিলে শুধু এটুকু স্বীকার করা হয়েছে যে, সদস্যদের মধ্যে ‘ভিন্নমত’ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই সংঘাত নিয়ে ভারতে অনুষ্ঠিত এটি ছিল টানা দ্বিতীয় ব্রিকস সম্মেলন, যা কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো।
শুক্রবার (১৫ মে) আলজাজিরার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রানিয়াম জয়শঙ্করের সভাপতিত্বে গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ভারতের নয়াদিল্লিতে এই বৈঠকটি শুরু হয়। ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতি হিসেবে ভারতের অধীনে এটিই ছিল প্রথম বড় কোনো মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করে উন্নয়নশীল ১০টি দেশের এই জোট। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার ও জোরালো অবস্থান তুলে ধরাও এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে ব্রিকসের একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও ব্রিকস বৈঠক
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটি এখন ৭৭তম দিনে পদার্পণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এর ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো স্থমকিতে পড়ে। গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। এই যুদ্ধকালীন উত্তেজনার মধ্যেই নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হলো। বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কারণে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকতে না পারায় ভারতের নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং দেশটির প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মিশর ও ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এতে অংশ নেন। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবর্তে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে পাঠায়।
বৈঠকে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুমুল বাকযুদ্ধ
ব্রিকসের দুই পূর্ণ সদস্য—ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংঘাতের দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে, যা বৈঠকে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইউএই-এর নাম প্রথমে এড়িয়ে গেলেও পরে অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি ইরানের ওপর মার্কিন হামলায় সহায়তা করেছে এবং তাদের ভূখণ্ড ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে দিয়েছে। এমনকি সংঘাতের প্রথম দিনে ইরানের একটি স্কুলে হামলায় ১৭০ জন ছাত্র নিহতের ঘটনায় আবুধাবি নিন্দা পর্যন্ত জানায়নি। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি আল মারার এই অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইরান তাদের দেশের বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং তারা এ পর্যন্ত দুই হাজার ৮০০টিরও বেশি ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছেন।
ভারতের অবস্থান
দুই দেশের এই তীব্র বিবাদ সামাল দিতে গিয়ে বৈঠকের সভাপতি ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রানিয়াম জয়শঙ্কর আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ ও বাধাহীন সামুদ্রিক যোগাযোগের আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন, একতরফা নিষেধাজ্ঞা বা চাপ কখনো কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না এবং ব্রিকসের অগ্রগতির জন্য সব সদস্যের ঐকমত্য মেনে চলা জরুরি। তবে শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ নিয়ে কোনো যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ব্রিকস। ইরান চেয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে, আর ইউএই চেয়েছিল ইরানের হামলার নিন্দা করতে। কোনো পক্ষই ছাড় না দেওয়ায় চূড়ান্ত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি; ফলাফল দলিলে কেবল সদস্যদের মধ্যে ‘ভিন্নমত’ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
এদিকে সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক জওহর সেলিম মনে করেন, ব্রিকস দেশগুলোর বৈচিত্র্যময় বৈদেশিক স্বার্থ ও ভিন্ন কর্মসূচির কারণে এমন একটি সংঘাতের বিষয়ে একমত হওয়া কখনোই বাস্তবসম্মত ছিল না। তার মতে, বর্তমান যুগে এই ধরনের বহুজাতিক জোটের রাজনীতি ক্রমশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ ইসলামাবাদ কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের দিকে না গিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রেখে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পেরেছে।