পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে ইসলামাবাদ। ফলে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের সামরিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের এই মোতায়েনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এবারই প্রথম প্রকাশ্যে এলো। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দুইজন সরকারি সূত্র। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কেবল প্রতীকী সহায়তা নয়, বরং যুদ্ধ সক্ষম একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক বাহিনী, যার উদ্দেশ্য সৌদি আরবকে সম্ভাব্য হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
তবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবের সরকারি গণমাধ্যম বিভাগ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
সূত্রগুলো জানায়, গত বছর সই করা পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তির বিস্তারিত শর্ত গোপন রাখা হলেও উভয় দেশই একমত হয়েছে যে, যেকোনো বহিরাগত হামলার ক্ষেত্রে তারা একে অপরের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এর আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরব কার্যত পাকিস্তানের ‘পারমাণবিক নিরাপত্তা ছাতার’ আওতায় এসেছে।
নিরাপত্তা সূত্রগুলোর মতে, পাকিস্তান প্রায় ১৬টি যুদ্ধবিমান নিয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াড্রন সৌদি আরবে পাঠিয়েছে। এর বেশিরভাগই চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান। এপ্রিলের শুরুতে এসব যুদ্ধবিমান সৌদি আরবে পৌঁছায়। এছাড়া পাকিস্তান দুটি ড্রোন স্কোয়াড্রনও মোতায়েন করেছে বলে জানিয়েছেন দুইজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা।
এছাড়া মোতায়েন করা হয়েছে চীনা এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিহত করতে সক্ষম। সামরিক সরঞ্জামগুলো পাকিস্তানি সেনাসদস্যরাই পরিচালনা করছেন এবং পুরো মোতায়েনের অর্থায়ন করছে সৌদি আরব।
সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমানে মোতায়েন থাকা সেনাসদস্যদের প্রধান দায়িত্ব পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা। তবে প্রয়োজনে তারা সরাসরি যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও অংশ নিতে পারবেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে সামরিক সম্পদ মোতায়েন ও বার্তা আদান-প্রদানের বিভিন্ন নথিও তারা দেখেছেন।
তিনজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আরও জানান, নতুন এই মোতায়েনের আগেও পূর্ববর্তী চুক্তির আওতায় কয়েক হাজার পাকিস্তানি সেনা সৌদি আরবে অবস্থান করছিল। তারা মূলত যুদ্ধ সহায়তা ও সামরিক সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করতেন।
সরকারি সূত্রের একজন জানান, গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রয়োজনে সৌদি সীমান্ত সুরক্ষায় সর্বোচ্চ ৮০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের বিষয়টিও চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। যদিও কোনো যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং হাজারো সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে পাকিস্তান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৌশলগতভাবে সম্পৃক্ত। এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতায় নতুন সামরিক ভারসাম্যও তৈরি করতে পারে।
এর আগে রয়টার্স জানায়, ইরানের হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পাকিস্তান যুদ্ধবিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ওই হামলায় এক সৌদি নাগরিক নিহত হন। এরপর আশঙ্কা দেখা দেয়, সৌদি আরব বড় ধরনের পালটা হামলা চালাতে পারে এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে পরবর্তীতে পাকিস্তান যুদ্ধের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়। ইসলামাবাদ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গত ছয় সপ্তাহ ধরে সেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার আয়োজনও করেছিল পাকিস্তান। যদিও পরবর্তী দফার আলোচনা পরে বাতিল হয়ে যায়।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, সৌদি আরবও ইরানের অভ্যন্তরে কয়েকটি অপ্রকাশিত হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো পক্ষই বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সামরিক মিত্র। প্রশিক্ষণ, সামরিক উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা সহায়তার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে সৌদি আরবও বারবার পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই মোতায়েন শুধু দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার বিষয় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠারও ইঙ্গিত বহন করছে।