যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ইসলামিক সেন্টার অফ সান ডিয়েগো (আইসিএসডি)-তে বন্দুকধারীদের গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। আত্মঘাতী গুলিতে প্রাণ গেছে সন্দেহভাজন দুই বন্দুকধারীরও।
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার (১৮ মে) জোহরের নামাজের আগে গুলির এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন বন্দুকধারীদের দুজন গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। বন্দুকধারীদের একজনের বয়স ১৭ বছর। আরেকজনের ১৯ বছর।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহত ব্যক্তিদের একজন ওই সেন্টারের নিরাপত্তা প্রহরী ছিলেন। যিনি হামলা থেকে অনেকের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সান ডিয়েগো পুলিশ প্রধান স্কট ওয়াল একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এটা বলাই যায় যে তার কাজ ছিল বীরত্বপূর্ণ। নিঃসন্দেহে তিনি আজ অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন।’
কর্তৃপক্ষ এখনও নিহত তিনজনের নাম প্রকাশ করেনি। তবে নিরাপত্তাকর্মীটি আট সন্তানের জনক ছিলেন বলে তার পরিচিত এক ব্যক্তি বিবিসির মার্কিন সহযোগী সংস্থা সিবিএসকে জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ বিবেচনায় নিয়ে এ ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) তদন্ত শুরু করেছে। এফবিআই এ বিষয়ে জনসাধারণের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছে। তথ্য জানানোর জন্য একটি বিশেষ নম্বরও দেওয়া হয়েছে।

নিহতের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: বিবিসি
এফবিআইয়ের কর্মকর্তা মার্ক রেমিলি জানান, এ ঘটনায় পুলিশের দিক থেকে কোনো গুলি চালানো হয়নি।
বিবিসি’র খবরে বলা হয়, এ ঘটনা এমন এক সময় ঘটল যখন কর্মকর্তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া এক আত্মহত্যাপ্রবণ কিশোরের বিষয়ে পাওয়া একটি ফোনকলের তদন্ত করছিলেন।
সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে গুলি চালানোর খবর পেয়ে পুলিশকে সতর্ক করা হয় এবং তারা ভবনটির সামনে বাইরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনজনকে খুঁজে পান।
এর কিছুক্ষণ পরেই, তারা আরেকটি ফোনকল পান যে কাছাকাছি একটি গাড়ি থেকে একজন ল্যান্ডস্কেপারকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। কর্মকর্তারা মসজিদ থেকে কয়েক ব্লক দূরে একটি গাড়ির ভেতর থেকে সন্দেহভাজনদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন।
সান ডিয়েগোর ক্লেইরমন্ট এলাকায় ওই ইসলামিক সেন্টারের অবস্থান। সেখানে সান ডিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদটি রয়েছে। আরও রয়েছে শিশুদের ইসলামি বিদ্যালয়।
দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, শহরের পুলিশপ্রধান স্কট ওয়াহল বলেন, ‘যেকোনো সম্প্রদায়ের জন্যই এটি ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনা।’
ইসলামিক সেন্টারটির বিদ্যালয়ে থাকা শিশুদের সবাই এ ঘটনায় অক্ষত আছে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
গতকাল বিকেলে সান ডিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এখন বিপদ কেটে গেছে। শিশুরা নিরাপদ আছে—এটা ভালো খবর।’
সাংবাদিকদের সামনে মেয়র আরও বলেন, ‘সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আপনাদের আশ্বস্ত করছি, এ শহরে আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয় শার্প মেমোরিয়াল হাসপাতালের মুখপাত্র জানান, এ ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের ওই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে কতজন সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন, সেই সংখ্যা জানাননি তিনি।

গুলির পর দ্রুত বের হয়ে আসছেন আতঙ্কিত অভিভাবক ও শিশুরা। ছবি: রয়টার্স।
ইসলামিক সেন্টারটির পরিচালক ও ইমাম তাহা হাসান বলেন, ‘আমরা এর আগে কখনোই এমন ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হইনি। এ মুহূর্তে আমরা দোয়া করছি এবং আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াচ্ছি। যেকোনো উপাসনালয়কে লক্ষ্যবস্তু বানানো অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।’
গুলিতে হতাহতের এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)। প্রতিষ্ঠানটির সান ডিয়েগোর নির্বাহী পরিচালক তাজহিন নিজাম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রার্থনা কিংবা শিশুদের স্কুলে পড়ার সময় কাউকেই যেন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকতে না হয়।’
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গাভিন নিউসাম বলেছেন, ‘আজকের গুলির ঘটনায় স্বজন হারানো পরিবার আর শোকসন্তপ্ত মানুষদের প্রতি ক্যালিফোর্নিয়াবাসীর পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। এখানে ঘৃণার কোনো জায়গা নেই। আমরা কোনোভাবেই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাস বা ভীতি–প্রদর্শন সহ্য করব না।’
ইসলামিক সেন্টারে গুলির ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেকও জানানো হয়েছে। ট্রাম্প এটিকে ‘একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এ ঘটনার পর লস অ্যাঞ্জেলসের বিভিন্ন মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার ও উপাসনালয়ে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট হুমকি না থাকার পরও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে শহরের মসজিদসহ উপাসনালয়গুলোয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্কের পুলিশও।