আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোয় ইবোলার প্রাদুর্ভাবে কমপক্ষে ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ৫১৩ জনের বেশি মানুষ ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, দেশটির স্থানীয় কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ডিআর কঙ্গো (ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো) সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, এখন আরও বিস্তৃত এলাকাজুড়ে আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, উগান্ডাতেও দুজন আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ইবোলা ভাইরাসের বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে জনস্বাস্থ্যগত আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইবোলার ‘বুন্ডিবুগ্যো’ ধরন এই প্রাদুর্ভাবের কারণ।
এই মারাত্মক ইবোলা প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়তে থাকায়, কঙ্গো সরকার জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। সরকার বলছে সংক্রমণ শনাক্ত করতে স্বাস্থ্যকর্মীরা কঠোর পরিশ্রম করছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
তবে, ইতুরি প্রদেশের নিয়াকুন্দে, উত্তর কিভুর বুটেম্বো এবং গোমা শহরসহ নতুন নতুন এলাকায় রোগী শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ অনিবার্যভাবে বাড়ছে।
ডিআর কঙ্গোতে কর্মরত একজন আমেরিকান ডাক্তারও আক্রান্ত হয়েছেন বলে তার সঙ্গে কর্মরত চিকিৎসা মিশনারি দল এবং সিডিসি জানিয়েছে।
এদিকে কঙ্গোয় অবস্থানকারী এক মার্কিন চিকিৎসকও ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি যে মেডিক্যাল মিশনারি দলের সঙ্গে কাজ করছিলেন, সেই দলসহ সিডিসি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিবিএস নিউজকে তারা বলেছে, চিকিৎসার জন্য ওই ব্যক্তিকে এখন জার্মানিতে নেওয়া হবে। তবে ওই চিকিৎসকের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
তবে চিকিৎসা মিশনারি দল সার্জ জানিয়েছে, তাদের একজন মার্কিন চিকিৎসক, পিটার স্টাফোর্ড, ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন।
দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে সংস্পর্শে আসা তাদের দলের অন্য দুই চিকিৎসকও আক্রান্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে স্টাফোর্ডের স্ত্রী ডক্টর রেবেকা স্টাফোর্ডও রয়েছেন। তবে তাদের শরীরে কোনো উপসর্গ ছিল না এবং তারা কোয়ারেন্টাইনের নিয়মকানুন মেনে চলছিলেন।
একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সিবিএস নিউজ আরও জানায়, কঙ্গোতে বর্তমান প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর অন্তত ছয়জন মার্কিন নাগরিক ইবোলা ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন।
সিডিসি বলেছে, সরাসরি প্রভাব পড়া অল্পসংখ্যক মার্কিন নাগরিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজে তারা সহায়তা করছে।
তবে ঠিক কতজনকে সরানো হচ্ছে, তা নিশ্চিত করেনি সংস্থাটি।
স্বাস্থ্যবিষয়ক সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট এসটিএটি একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, কঙ্গোয় থাকা মার্কিন নাগরিকেদের ওই ছোট দলটিকে নিরাপদ কোয়ারেন্টিন এলাকায় নেওয়ার জন্য পরিবহনের ব্যবস্থার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
একটি সূত্রের বরাতে খবরে বলা হয়, ওই দলটিকে জার্মানিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নেওয়া হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে সিডিসি কর্তৃপক্ষ আক্রান্ত মার্কিন নাগরিকদের বিষয়ে করা প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
গতকাল সোমবার সংস্থাটি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলার ঝুঁকি তুলনামূলক কম। তবে রোগটি যেন দেশটিতে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে তারা নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এ ধরনের একটি পদক্ষেপ হলো, আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আসা যাত্রীদের নজরদারিতে রাখা। এ ছাড়া গত ২১ দিনের মধ্যে উগান্ডা, কঙ্গো বা দক্ষিণ সুদানে অবস্থান করেছেন, এমন অ–মার্কিন পাসপোর্টধারী ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ।
সিডিসি জানিয়েছে, তারা উড়োজাহাজ সংস্থাসহ অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে কাজ করে যাত্রীদের সংস্পর্শ অনুসন্ধান (কনট্যাক্ট ট্রেসিং), পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি জোরদারের ব্যবস্থা করবে।
এদিকে মার্কিন নাগরিকদের ডিআর কঙ্গো ভ্রমণের ক্ষেত্রে চার মাত্রার সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মাত্রার ভ্রমণ সতর্কতা।
ডব্লিউএইচও বলেছে, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে ইবোলার প্রাদুর্ভাব এখনো মহামারির পর্যায়ে যায়নি।
তবে ডব্লিউএইচও সতর্ক করে বলেছে, বর্তমানে যত সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে, বাস্তবে পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বড় আকার ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় ও আঞ্চলিকভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৬ সালে ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে। পশ্চিম আফ্রিকায় সে সময় ২৮ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছিল।
সে সময় এই রোগ পশ্চিম আফ্রিকার ভেতরে–বাইরে কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে ছিল গিনি, সিয়েরা লিওন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইতালি। ওই প্রাদুর্ভাবে ১১ হাজার ৩২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।