কয়েক দশকের মধ্যে নেপালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া একটি সুড়ঙ্গে নয় দিন ধরে আটকে ছিলেন কবির মহারজন। সম্পূর্ণ অন্ধকারে কাদা জলের একটি পুকুরে প্রলাপ বকতে বকতে তিনি বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন এবং জ্ঞান ফিরে পাচ্ছিলেন।
এরপর অলৌকিকভাবে উদ্ধারের পর যখন তিনি অবশেষে একটি হাসপাতালে জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন তিনি তার স্ত্রীকে চিনতে পারলেন না। বিভ্রান্ত হয়ে তিনি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি তাকে আরও আগে একটি বিছানা দেননি।
মহারজন ছিলেন সেই শত শত জলবিদ্যুৎ কর্মীদের মধ্যে একজন, যারা ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার উপরে একটি হিমবাহ ধসের নিচে চাপা পড়েছিলেন। এই ধসের ফলে কাদা ও জলের একটি স্রোত নেমে আসে, যাতে নেপাল এবং প্রতিবেশী তিব্বত জুড়ে ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হন।
উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া প্রবীণ টানেল ইঞ্জিনিয়ার এবং সাংসদ শ্রী রাম নিউপানে জানান, উদ্ধার হওয়া কবির এবং মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ একটি বায়ুপূর্ণ চেম্বারে থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
নেপালের উদ্ধারকারী দলগুলোর আশা ছিল, সোমবার (৩১ আগস্ট) পর্যন্ত টানেলের ভেতরে আটকা পড়া ১২১ জন শ্রমিকের মধ্যে কেও কেও তখনো জীবিত থাকতে পারেন।
রয়টার্স এক ডজন মানুষের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছে। যার মাধ্যমে এই শ্রমিকদের বেঁচে থাকা এবং তাদের বাঁচানোর জন্য চালানো প্রাণপণ চেষ্টার সম্পূর্ণ কাহিনী তারা তুলে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের আত্মীয়স্বজন, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা এবং এই অভিযানে সরাসরি জড়িত উদ্ধারকারীদের দেওয়া অপ্রকাশিত বিবরণ, ঘটনাস্থলের নথি, মানচিত্র এবং উদ্ধারকারীদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কথোপকথন পর্যালোচনা।
কি ঘটেছিল সেদিন
দুর্ঘটনার দিন স্থানীয় সময় সকাল ৭:৩০ মিনিটে আপার ত্রিশুলি ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কবিরের শিফট শুরু হওয়ার আগে তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করেন।
তিনি তাকে বলেন, ‘আমাকে টানেলের ভেতরে যেতে হবে। ভেতরে কোনো নেটওয়ার্ক থাকবে না।’
প্রায় ৬০ মিনিট পর, ২৫ মাইল উজানে লাংটাং লিরুং পর্বতের একটি হিমবাহ মাটিতে ধসে পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট ভূমিধস এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা জলের এক দেয়াল তৈরি করে গ্রামগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয় এবং প্রায় ৯০০ কর্মীসহ ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি নেটওয়ার্ককে ডুবিয়ে দেয়।

জীবিত উদ্ধার হওয়া দুইজনের মধ্যে একজন সঞ্জয় সাহ। রয়টার্স
জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে জীবিত উদ্ধার
হিমবাহ ধসে এলাকাটি কাদায় চাপা পড়ার নয় দিন পর, ৪ সেপ্টেম্বর নেপালের আপার ত্রিশুলি ৩এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত একটি সুড়ঙ্গ থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের স্ক্রিনে প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তারপর চারপাশ ফাঁকা হতে শুরু করল—একটার পর একটা স্টেশন কন্ট্রোল প্যানেল থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকল।
উদ্ধার অভিযানের একাংশের নেতৃত্ব দেওয়া নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী সুরজ দাহাল বলেন, ‘তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শঙ্কিত হননি কারণ নেপালে বন্যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা।’ তবে শীঘ্রই তারা ভিন্ন চিত্রটি বুঝতে পারলেন। ৩এ স্টেশনের ম্যানেজার বিদেশে থাকায়, ভেতরে থাকা আনুমানিক ৪০ জন কর্মীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে কর্মকর্তাদের দুই মিনিট বেশি সময় লেগেছিল। ততক্ষণে উজানের অন্তত দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সকাল ৯:১৫ মিনিটে-কবিরের স্ত্রী হীরা শোভা মহারজন তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এর ঠিক দুই মিনিট পর—কর্মকর্তারা ৩এ-কে চূড়ান্ত আদেশ দেন, ‘সরে যান!’
পাওয়ার হাউসের কন্ট্রোল রুমে কর্মরত সাহ উদ্ধারকারীদের জানান, তিনি এক তলা থেকে আরেক তলায় দ্রুত ছুটে গিয়ে সহকর্মীদের একে একে সতর্ক করছিলেন। টানেলের বাইরে, উদ্ধারকারী কর্মীরা বন্যার পানি থেকে বাঁচতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তারা দ্রুত সরতে পারেননি। কর্মকর্তারা এমন একটি ফুটেজের কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে দেখা যায়, প্রায় ৩০ জন কর্মীর একটি দল তাদের চেয়ে বহুগুণ উঁচু একটি ঢেউয়ে ভেসে যান।
দাহাল বলেন, উদ্ধারকারীরা পরে একটি মই শনাক্ত করেন, যেটা সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকলে ভেতরে থাকা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মীকে বাঁচানো যেত।
তিনি বলেন, কোথায় যেতে হবে তা তারা জানতেন না।
রয়টার্সের দেখা ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা অনুযায়ী, টানেলের চারটি প্রবেশপথের মধ্যে একটি ১৮০ মিটারেরও বেশি দীর্ঘ ছিল যা ভূগর্ভস্থ পাওয়ার হাউস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু উদ্ধারকারীরা মনে করেছিলেন যে সেটি সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছিল, ফলে বেঁচে থাকার কোনো আশা ছিল না।
এর পরিবর্তে নিউপানে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট, উপরের দিকে ঢালু কেবল-ডাক্ট টানেলের দিকে মনোযোগ উদ্ধারকারীরা মনোযোগ দিলেন যেটাতে বন্যার পানি কম ঢুকেছিল।
সেখানেই কবির মহারজন ও সাহ আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেটা টানেলের নির্গমন পথ থেকে মাত্র ১৬০ মিটার দূরে ছিল। কবির পরে তার স্ত্রীকে বলেন সেটা ছিল ‘কোণায়, টানেলের কিনারায়।’

একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের কাছে একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নেপাল সেনাবাহিনীর একজন সদস্য। রয়টার্স।
আরও খারাপ কিছু ঘটার ভয়
পরবর্তী নয় দিন ধরে, যে বায়ু পকেটটি তাদের জীবন বাঁচিয়েছিল, সেটিই তাদের কারাগারে পরিণত হলো। সাহ বলেন, সাহস ধরে রাখার জন্য তিনি হিন্দু মন্ত্র পাঠ করতেন। কবিরের স্ত্রী জানান, বেঁচে থাকার জন্য সেই একই ঘোলা জল তিনি পান করতেন, যে জলে তিনি ঘুমাতেন।
কর্মকর্তারা ভাবছিলেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা অক্সিজেন পকেট হয়তো কিছু কর্মীকে বাঁচতে সাহায্য করতে পারে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রধান ধর্মরাজ উপ্রেতি জানান, উপত্যকা জুড়ে ৭,৫০০-এরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। উদ্ধারকারীদের প্রথমে কোথায় খনন করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু ৩এ তালিকার প্রায় শীর্ষে ছিল, কারণ কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন এর টারবাইন এবং বায়ুচলাচল তলের বহুতল কাঠামোতে হয়তো বাতাসের পকেট আটকে থাকতে পারে।
সাফল্য
উদ্ধার অভিযানের দশম দিনে ৪ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টায়, দাহাল একজন ভারী সরঞ্জাম চালকের কাছ থেকে একটি ফোন পেলেন। উদ্ধারকারীরা কিছু একটা শুনেছে। একটা শব্দ। হয়তো কোনো জীবিত ব্যক্তি। হয়তোবা অন্ধকারে উদ্ধারকারীদের নিজেদের কণ্ঠের ডাকেরই প্রতিধ্বনি।
উদ্ধারকারী দলের নেতৃত্বদানকারী গঙ্গা বারাল বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে ড্রিল করার সময় তারা শব্দ শুনতে শুরু করেন। শোনার জন্য তারা বারবার তাদের মেশিনের ইঞ্জিন বন্ধ করছিলেন। বারাল বলেন, ‘আমরা চিৎকার করে বলছিলাম, ‘তোমরা কোথায়? তোমরা কি ওখানে আছো? মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যেন কোনো জীবিত ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছে।’
তারা তখনও কোনো কথা বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু তারা অনুমান করলেন যে শব্দের উৎস মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরে। তারপর, একটি আলোর রশ্মিতে তারা একটি হাত দেখতে পেলেন। সেইসময় তাদের এবং সেই জীবিত ব্যক্তির মধ্যে আরও ৫ থেকে ১০ মিটার কাদায় ভরা পথ বাকি ছিল। সকাল ৭টা নাগাদ, সৈন্যরা একটি ছোট গর্ত খুঁড়ে ফেলেন।
ভেতর থেকে একটিমাত্র শব্দ ভেসে এল, ‘হুনুহুঞ্চা’, যার অর্থ হলো ‘আমরা এখানে আছি।’

সুড়ঙ্গে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। রয়টার্স।
অবশেষে আলোর দেখা
উদ্ধারকারীরা যখন অবশেষে তাদের সুড়ঙ্গ থেকে টেনে বের করল, তখন দুজনের কেউই উঠে দাঁড়াতে পারছিল না। কাদায় মাখামাখি মুখ নিয়ে সাহকে একজন উদ্ধারকারী পিঠে করে বাইরে নিয়ে আসে। সে কোনোমতে একটি ক্যামেরার দিকে এক হাত তুলতে পেরেছিল। আরও গুরুতর আঘাত নিয়ে কবির মহারজানকে স্ট্রেচারে করে বের করে আনা হয়।
‘মা, বাবা ফিরে এসেছে!’ সন্তানেরা চিৎকার করে উঠল।
ধাকাল বাইরে থেকে অভিযানটি পরিচালনা করছিলেন কিন্তু নিজে কখনও টানেলের ভেতরে প্রবেশ করেননি, দুজন মানুষ বেরিয়ে আসতে দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন।
তিনি বলেন, ‘আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।’
পরের দিন চীনা নাগরিক লু হাইতাওকে আপার ত্রিশুলি-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি পৃথক স্টেশনের টানেল থেকে উদ্ধার করা হয়।
কবির মহারজনের স্ত্রী জানান, ডাক্তাররা মহারজনের পায়ের একটি গভীর, সংক্রামিত ক্ষতের অস্ত্রোপচার করেন। স্ত্রী হীরা শোভা যখন হাসপাতালের ঘরে প্রবেশ করলেন, তিনি তাকে চিনতে পারলেন না। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কোথায়?’ তাকে জীবিত ফিরে পেয়ে তার পরিবার অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। হীরা শোভা বলেন, ‘তিনি আরেকটি জীবন পেয়েছেন।’