ঢাকা: অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ফ্যাসিবাদ দেশের অর্থনীতির যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে- এতে এর পুনরুদ্ধার ও এটাকে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন, অর্থাৎ সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া এই রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
‘অনেক আগে থেকেই বিএনপি এই রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ সময়ে বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে সকল প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করেছে। তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে মূলত লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মৌল ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যর্থতাগুলোকে ঢাকা হয়েছে মিথ্যা পরিসংখ্যান ও কথার ফুলঝুরি দিয়ে। কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকা শক্তি, অর্থাৎ অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে। আমরা সেই ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকে নতুন যাত্রার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাইছি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান অবস্থার পুনরুদ্ধার এবং একে উত্তরণ ও সমৃদ্ধ পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে জনগণ বিএনপি’র ওপর ভরসা করায় বর্তমান সরকার সেই দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনে প্রস্তাবিত বাজেট হচ্ছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণে সরকারের অভিপ্রায়ের একটি প্রতিফলন।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা- গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের ওপর জোর দিয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলাম। সরকার গঠনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সে লক্ষ্যে আমরা এরই মধ্যে কাজও শুরু করেছি।’
তিনি বলেন, ‘তবে এ অভিযাত্রার শুরুতেই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে আমরা নতুন ও তীব্রতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে- স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।’ এ পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বাজেট প্রণয়নে ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এর পাশাপাশি মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি ও সুনীল অর্থনীতির মতো খাতগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসা হবে। বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ও বাস্তবায়নে নীতিগতভাবে চারটি বিষয় প্রধান বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- (১) ভ্যালু ফর মানি- অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার; (২) রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট- অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসকল প্রকল্পে বিনিয়োজিত হচ্ছে- এর কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন; (৩) কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা এবং (৪) পরিবেশগত বিবেচনা- অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।’
বাজেট বাস্তবায়নে দেশের সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা কামনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারাবাহিক পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ এবং জাতীয় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হবে। জনগণের শক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই শক্তিকে বিকশিত করার মধ্য দিয়েই আমরা গণমানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই, সমস্যার সমাধান করতে চাই এবং সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে তুলতে চাই গণআকাঙ্ক্ষার এক স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রত্যয় এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সুযোগের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, উদ্যোগ ও উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে যাবে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, বিনিয়ন্ত্রণকরণ ও জনগণের ক্ষমতার ভিত্তিতেই আমরা একটি সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ নির্মাণ করব।’