Tuesday 22 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জ্বালানি তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আসার নিশ্চয়তা নেই: ডা. জাহেদ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:০৬

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান

ঢাকা: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সাময়িকভাবে কিছুটা কমলেও সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আসার নিশ্চয়তা নেই।’

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত দুই-তিন দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে এখনো প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি। এই দাম কমার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।‘

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘বর্তমান মূল্য সমন্বয়ের পরও ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রতি লিটারে সরকারের উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি রয়েছে। কাগজে-কলমে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জ্বালানি খাতে সরকারের ওপর বড় ধরনের ভর্তুকির চাপ থাকছে।’

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটের পাশাপাশি সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রেও নানা ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশটির ইস্ট-টু-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির চেষ্টা থাকলেও সেটিও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।’

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার কারণে দেশটির অভ্যন্তরেও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সরকার জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জনগণের কষ্ট হচ্ছে এবং আরও কষ্ট হতে পারে— এটি সরকার স্বীকার করছে। তবে সরকার ইচ্ছা করে জনগণকে অসন্তুষ্ট করার জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেয়নি।‘

তিনি বলেন, ‘সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণকে কষ্ট দিয়ে সরকার নিজের রাজনৈতিক ক্ষতি করতে চাইবে— এমন কোনো কারণ নেই। তবে জ্বালানি খাতে কতটা ভর্তুকি দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।‘

গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের বাজেটে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছরের মাত্র আড়াই মাসেই এর প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে ভর্তুকি দেওয়ার ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ সোয়া এক লাখ কোটি থেকে দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য খাতের ভর্তুকি যোগ হলে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।’

সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ভর্তুকির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও সরকার ব্যয় করতে চায়। ফলে সীমিত সম্পদ কোথায় কতটা বরাদ্দ করা হবে, সেখানে সরকারকে ভারসাম্য করতে হচ্ছে।’

পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার যৌক্তিকভাবে পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে সহায়তা কর্মসূচি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি জানান, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি ও ওএমএসের আওতা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অক্টোবর থেকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কার্যক্রমও শুরু হবে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব করার চেষ্টা থাকবে।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো প্রসঙ্গে

সংবাদ সম্মেলনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সংকটের মধ্যেও সরকারের বিভিন্ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করতে হয়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই নেওয়া হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ১০-১১ বছর ধরে তা আর সংশোধন হয়নি। এ সময়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন চাকরি করা কর্মচারীদের প্রকৃত আয় অনেকটাই চাপে পড়েছে।’

তার ভাষ্য, নতুন করে চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের পুরোনো বেতন কাঠামো একটি সংকট তৈরি করেছে। এ কারণেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করছে। এর মাধ্যমে সীমিত সম্পদের মধ্যে বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

পেট্রোল-অকটেনের দাম বাড়ানো নিয়েও ব্যাখ্যা

পেট্রোল ও অকটেনের বড় অংশ দেশে উৎপাদিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও এসব জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম বাড়ানো উচিত কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেশে কনডেনসেট থেকে পেট্রোল উৎপাদন করা হলেও দেশের চাহিদা পূরণের জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘কনডেনসেট থেকে পাওয়া পেট্রোল দেশের মোট চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য উৎসের ওপরও নির্ভর করতে হয়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পেট্রোল ও অকটেনের দামেও তার প্রভাব পড়ে।’

পেট্রোল ও অকটেন ব্যবহারকারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পেট্রোলের ব্যবহারকারীদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালকরাও রয়েছেন। তবে তুলনামূলকভাবে সামর্থ্যবান ভোক্তাদের ওপর কিছুটা বেশি মূল্যভার দেওয়ার নীতি সরকারের দীর্ঘদিনের।’

তবে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ানোর পেছনে অতিরিক্ত মুনাফা করার উদ্দেশ্য নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘এসব জ্বালানির একটি বড় অংশই আমদানিকৃত ক্রুড অয়েলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখানেও পড়ছে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর