Friday 23 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর / বিনিয়োগ ও জনশক্তি রফতানিতে জোর দেবে বাংলাদেশ

অপূর্ব কুমার
২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৯ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৩

ছবি: সংগৃহীত।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর দেশটিতে সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেবে বাংলাদেশ। এগুলো হলো দুই দেশের মধ্যে বড় বিনিয়োগ, বাণিজ্য, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানো। চলতি সফরে বেশ কয়েকটি নতুন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সফরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে কূটনীতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তি খাতের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপান বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। জাপান ও বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান সম্পর্ককে আরও নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে চায়।

বিজ্ঞাপন

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজার, তরুণ জনশক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনা জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সফরকে শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৬-২৯ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।

গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আল সিয়াম বলেন, আগামী ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সহযোগিতা গুরুত্ব পাবে আসন্ন এ সফরে। সফরে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, যার মধ্যে অন্তত চারটি সই হওয়ার প্রত্যাশা করছে ঢাকা।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও গভীর ও সময়োপযোগী করার সুযোগ তৈরি হবে।

আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া জাইকার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক এবং জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তার।

এর আগে, গত ১২ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান সপ্তম পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের বৈঠকে জাপানের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। জাপানের সিনিয়র উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হিরোয়ুকি নামাজু জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির আমন্ত্রণ বাংলাদেশের কাছে পৌঁছে দেন। ওই বৈঠকে দুই দেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করে। সফরের মূল লক্ষ্য হবে এসব আলোচনাকে বাস্তব সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য চুক্তির দিকে এগিয়ে নেওয়া।

১৪ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর জাপান সফরকালে দেশটির কাছে ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজের প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। ২০২৬-৩১ মেয়াদের প্রস্তাবিত এই প্যাকেজের আওতায় ১২টি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কিছু খাত বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এই প্যাকেজ সহায়তা প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে- পরিবহন ও নগর যোগাযোগ ব্যবস্থায় ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে এমআইডিআই ও মাতারবাড়ী হাবের জন্য ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইলে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার ও জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীলতা খাতে ২.২২ বিলিয়ন ডলার, কৃষি, ব্লু ইকোনমি ও পর্যটন খাতে ১.২২ বিলিয়ন ডলার।

জাপানে দক্ষ জনশক্তি রফতানি

জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শিল্পে কর্মীর চাহিদার কারণে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠাতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬ সালের আগস্টের বিবৃতিতে জাপানে বাংলাদেশি বিশেষায়িত, দক্ষ শ্রমিক বা নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক পর্যায়ের বিনিময় বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। এই সফরে জনশক্তি রপ্তানি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি চলছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু। জাপানিরা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বাংলাদেশে যেন জাপানের বিনিয়োগ আরও বাড়ে, সে বিষয়টি প্রাধান্য পাবে বলে প্রত্যাশা করি। এছাড়া জাপান বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে অনুদান দিয়ে থাকে। তবে জাপানের অনুদান আগের চেয়ে কমে গেছে। বাংলাদেশে যেন জাপানের অনুদান অব্যাহত থাকে সফরকালে সে আলোচনা তোলা যেতে পারে।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বিনিয়োগই প্রধান অগ্রাধিকার

এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, সফরে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হবে তিনটি- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপানের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন নির্দিষ্ট খাতে পারস্পরিক বিনিয়োগের সুযোগ খোঁজা হবে।

হুমায়ুন কবির বলেন, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। আসন্ন সফরে খাতভিত্তিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলেও জানান তিনি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন সফরের গুরুত্ব বুঝতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সর্বশেষ জাপান সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ২০২৫ সালের ২৮-৩১ মে জাপান সফর করেন। ৩০ মে টোকিওতে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে তার শীর্ষ বৈঠক হয়। ওই সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রেল যোগাযোগ, জলবায়ু সহনশীলতা, বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল। সে সময় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের সঙ্গে ৬০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

দুই দেশের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য দিক

জাপানের সহায়তায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এগিয়ে চলেছে।

বাংলাদেশে ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান

বাংলাদেশে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জাপান। আগামী পাঁচ বছরে বেসরকারি খাতে এই বিনিয়োগ করবে দেশটি।

নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে যৌথ বিবৃতিতে আসবে এই ঘোষণা।

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে অনুষ্ঠেয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনে যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই বিনিয়োগের বিষয়টি ঘোষণা করা হবে।

এই ঘোষণার প্রধান লক্ষ্য, বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের হাব হিসেবে তৈরি করা, যেখানে অটোমোবাইল, উৎপাদন শিল্প এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

একই সঙ্গে জাপানি ট্রেডিং হাউস সুমিতোমো করপোরেশনসহ অন্যান্য অংশীদারদের দ্বারা তৈরি বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোনে জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে।

 

বিজ্ঞাপন

অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ৩ মন্ত্রী
২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০৪

আরো

অপূর্ব কুমার - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর