ঢাকা: সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া, নেট মিটারিংয়ের আওতায় উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে সক্ষম হবে সরকার।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে চায় সরকার। নেট মিটারিং ব্যবস্থায় নিজস্ব ব্যবহারের পর যারা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনা হবে। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া হবে।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সোলার এক্সপোর আয়োজন করা হয়েছে। নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
তিনি বলেন, ‘সোলার এক্সপোতে দেশের বিভিন্ন এলাকার সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোক্তা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে সাশ্রয়ী পন্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনার খাত নয়, এটি অনিবার্য বাস্তবতা।’
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যাতে শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বাংলাদেশকে সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সেই সংকটের মধ্য দিয়ে দেশ ও জনগণ এখনো যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকার ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিজেলের মজুত বাড়ানো হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লা সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা আলাদা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা বা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করে সময় নষ্ট করার পরিবর্তে আগামী দিনে কীভাবে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো যায়, সেটিই সরকারের অগ্রাধিকার। বাসাবাড়ি ও ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।’
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি, বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কষ্ট সম্পর্কে সরকার সচেতন। এ কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে একযোগে কাজ করছে সরকার।’
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। জনগণের প্রতি আহ্বান জানানোর আগে তিনি নিজেই নিজের বাসায় সৌর প্যানেল স্থাপন করেছেন। এরই মধ্যে বাসায় ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রায় প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সক্ষম হচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনই সরকারের লক্ষ্য নয়, জনগণের বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ কমানোও সরকারের অগ্রাধিকার।’
সৌরবিদ্যুৎ খাতে আট হাজারের বেশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহক প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেদিকে নজর রাখতে হবে।’ বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষকদের সেচের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বরেন্দ্র এলাকায় এ কাজ শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে ১৭ হাজার সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।’
সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়িত্ব। অন্যদিকে বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার জনগণের দায়িত্বের অংশ।
এ জন্য দিনের বেলায় যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহারের পাশাপাশি বাসা, অফিস ও ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাতি, পাখা ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের সহজ সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সোলার এক্সপো যেন কেবল দুই দিনের অনুষ্ঠান হয়ে শেষ না হয়। এখান থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি এবং ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ গড়ে উঠতে হবে। তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের বাস্তব উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা উন্নয়ন সহযোগীদের শুধু বড় প্রকল্পে নয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে হবে।’
অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপনকারী প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এ প্রতিযোগিতায় তিন শতাধিক মেধাবী তরুণ-তরুণী নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করেছেন। প্রত্যেককে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আগামীর বাংলাদেশে জ্ঞান ও উদ্ভাবনের এমন প্রতিযোগিতা অব্যাহত রাখতে চাই।’
তারেক রহমান বলেন, ‘একটি উদ্ভাবনী ধারণা বাংলাদেশের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে। অর্থের অভাবে যেন তরুণদের কোনো উদ্ভাবনী উদ্যোগ হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে চলতি বাজেটে স্টার্ট-আপের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী সোলার এক্সপো-২০২৬-এর বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব মিরানা মাহরুখ।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) যৌথভাবে এ এক্সপোর আয়োজন করে। এবারের এক্সপোর প্রতিপাদ্য—‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌর বিদ্যুতের আয় বাড়াই’।