Tuesday 03 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

টিআইবির গবেষণা নিয়ে জামায়াতের বিবৃতি বিভ্রান্তিমূলক: টিআইবি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৩ নভেম্বর ২০২৬ ১৯:৪১

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ফাইল ছবি

ঢাকা: ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন সম্পর্কে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গণমাধ্যমে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তা বিভ্রান্তিমূলক ও সত্যের অপলাপ বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে, আরপিও ১৯৭২ এর নামমাত্র প্রতিপালনের মাধ্যমে নারীদের স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করে দলের সর্বস্তরে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করা শুভঙ্করের ফাঁকি বলছে সংস্থাটি।

বাস্তবতা অস্বীকার করে দলটির পক্ষ থেকে এভাবে গবেষণা তথ্যকে ‘অসত্য’ আখ্যায়িত করে বিবৃতি দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে টিআইবি। তবে জামায়াত গবেষণা প্রতিবেদনটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করায় টিআইবির পক্ষ থেকে তাদের সাধুবাদ জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধায় টিআইবির পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছে।

টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, আরপিও, ১৯৭২ এর ধারা ৯০খ(১)(খ)(আ) অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সকল পর্যায়ের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ সদস্যপদ নারীদের জন্য সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণ করলে আইনের এই ধারা পরিপালনে ব্যাপক ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি বলতে কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী কমিটি বা কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ বা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদকে বোঝানো হয়েছে। সকল দলের ক্ষেত্রে একই ধরনের কমিটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ সময়কালে ১৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। যা আরপিওর সংশ্লিষ্ট বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যেখানে বলা হয়েছে দলের প্রতিটি কমিটিতে নারী সদস্য থাকতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন নারী সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এছাড়া, দলটির রুকনদের (সদস্য) মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী। এই গবেষণায় শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটি অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী পরিষদ বা কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো দলের জাতীয় বা কেন্দ্রীয় কাউন্সিল বা সম্মেলন বা মজলিশে শুরায় কতজন নারী আছে, সে বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। আরপিও, ১৯৭২-এ একটি দলে কতজন নারী সদস্য থাকবে, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। বরং নারী কর্মীদের মধ্যে থেকে কমিটিগুলোতে কতজন নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত হবে, সে বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ফলে সেক্রেটারি জেনারেলের এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ, সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়।

বাংলাদেশের অন্য সকল রাজনৈতিক দলের সকল স্তরে একটি করে কমিটি থাকে, সেখানে বিভিন্ন হারে নারীদের অন্তর্ভুক্তি লক্ষ করা যায়। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রে শুধুমাত্র নারীদের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি স্তরে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি স্তরে পুরুষদের জন্য একটি কমিটি এবং নারী কর্মীদের জন্য স্বতন্ত্র একটি কমিটি রয়েছে। একইভাবে নারী কর্মীদের স্বতন্ত্র মজলিসে শুরা বা কর্মপরিষদ রাখা হয়েছে। যদিও নারীদের জন্য পৃথক কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ রাখা হয়নি এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী কর্মী রাখা হয়নি।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বস্থানীয় কোনো পদে তথা জামায়াত আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ইত্যাদি পদে নারীকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত না করার চর্চা লক্ষ্য করা যায়। শুধুমাত্র নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার করতে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি করার মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রমে নারীদের প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি বোঝায় না। বরং এক্ষেত্রে নারীদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নারীদের এই স্বতন্ত্র কমিটিগুলোকে দলে নারীর অন্তর্ভুক্তি হিসেবে দাবি করা এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি।

অন্যদিকে, টিআইবির গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর দাবি অনুযায়ী তাদের দলের ৪৩ শতাংশ নারী সদস্য থাকলে তাদের মধ্যে থেকে একজন নারী সদস্যকেও নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। যদিও এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের বিবৃতিতে কোনো মন্তব্য করেনি।

এ ছাড়া, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা- ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মেনে না নেওয়া, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য সকল নিয়মনীতি ও পন্থাকে প্রত্যাখ্যান করা, ইসলামী আকিদা পরিপন্থী প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক না রাখা, দলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সাথে একমত পোষণ সাপেক্ষে অমুসলিম নাগরিকদের জন্য সহযোগী সদস্য বা সদস্যপদ দেওয়া, গঠনতন্ত্রে মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের জন্য ‘‘সদস্য বা সহযোগী সদস্য’’ পদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পৃথক শর্ত আরোপ, নারীকর্মীদের জন্য পৃথক বিভাগ বা কমিটি ও পৃথক কার্যক্রম পরিচালনা করা ইত্যাদি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের (সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ – ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্ম, লিঙ্গ প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অতএব, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি-বিষয়ক টিআইবির গবেষণালব্ধ তথ্যকে “অসত্য” বা “বিভ্রান্তিমূলক” বলে দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। বরং টিআইবি মনে করে এই বিবৃতির মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী গবেষণা তথ্যকে অস্বীকার এবং অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে দলের মধ্যকার প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। বাাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সকল রাজনৈতিক
দলগুলোকে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফলকে গুরত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে উত্থাপিত সুপারিশ অনুযায়ী নিজ নিজ দলের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আহ্বান জানাচ্ছে টিআইবি।

উল্লেখ্য, টিআইবির প্রতিটি গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সমাজবিজ্ঞানে অনুসৃত গবেষণাপদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং গবেষণায় তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতা নিশ্চিত করতে প্রাথমিকভাবে সংগৃহীত তথ্য বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উৎস হতে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্যতা বিধান, বিভিন্ন স্তর ও পর্যায়ে ক্রস চেকিংসহ সম্ভাব্য সকল সূত্র থেকে যাচাই-বাছাই করে গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। একইভাবে, আলোচ্য গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বা মনোনীত প্রতিনিধি ও দলের নেতা-কর্মী, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক ও গবেষকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ও দলীয় দপ্তর থেকে সংগৃহীত তথ্য, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, গবেষণা প্রবন্ধ ও পুস্তক থেকে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর