ঢাকা: সরকারি সেবা নিতে এসে কোনো নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সমর্থন থাকতেই পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন ঘটাতে হবে ব্যালট বাক্সে, সরকারি অফিসে নয়।
রোববার (৮ নভেম্বর) বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৮১তম ফাউন্ডেশন ট্রেনিং কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রশাসন একটি সরকারের সার্বিক সফলতার জন্য জরুরি। এসব বৈশিষ্ট্য শুধু একজন কর্মকর্তাকেই সমৃদ্ধ করে না, রাষ্ট্র ও সরকারকেও সমৃদ্ধ করে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে বর্তমানে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মকর্তারা বিভিন্ন ক্যাডারে যোগ দেবেন। কাজের ধরন ও কর্মস্থল আলাদা হলেও তাঁদের সবার প্রথম ও প্রধান পরিচয় তাঁরা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা। তাঁদের মূল দায়িত্ব জনগণের সেবা করা।
তারেক রহমান বলেন, একজন নাগরিক সহযোগিতার জন্য সরকারি অফিস-আদালতে গিয়ে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তা কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ‘ট্রিট আদার্স হাউ ইউ ওয়ান্ট টু বি ট্রিটেড’—অর্থাৎ নিজের সঙ্গে অন্যের কাছ থেকে যে ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করেন, অন্যের সঙ্গেও সে ধরনের আচরণ করার নীতি অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই বিধিবদ্ধ নিয়মের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে দায়িত্ব পালনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে মানবিক আচরণ করা হয়েছে কি না, আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রশাসনে সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো নাগরিক আবেদনপত্র নিয়ে এলে তাতে ভুল থাকলে শুধু সংশোধন করে আনতে বলাই যথেষ্ট নয়। বরং কোথায় ভুল হয়েছে, কোথায় গেলে তা সংশোধন করা যাবে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিলে সেটি হবে মানবিকতা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। জনগণ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শুধু আদেশ-নির্দেশ নয়, মানবিকতাও প্রত্যাশা করে।
পদায়ন ও পদোন্নতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদই রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় পছন্দের পদে পদায়ন কিংবা পদোন্নতির জন্য কেউ কেউ নিজেদের পেশাগত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে আপস করেন। যেকোনো সময় দেশের যেকোনো স্থানে জনপ্রশাসনের যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাকে তিনি চূড়ান্ত পেশাদারত্বের পরিচায়ক বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কোনো সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয়, জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।
রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমর্থন থাকাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে দোষের মনে করেন না। তবে সেই সমর্থনের প্রতিফলন সরকারি অফিসে নয়, ব্যালট বাক্সে ঘটতে হবে।
বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এবং তা জনপ্রশাসনের মাধ্যমেই করছে। তবে জনগণ নির্বাচনে ভোট দিয়ে এই সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল হিসেবে দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে। ফলে সেই ইশতেহার এখন জনগণের ইশতেহার ও দলিল। তা বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। প্রশাসনের কর্মকর্তারা আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালনে ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে সরকারি সেবা সহজ ও নাগরিকবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক উদ্যোগের চেয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইতিবাচক মানসিকতা বেশি কার্যকর। এ বিষয়ে তিনি কর্মকর্তাদের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ঘরবাড়ি, অফিস-আদালতসহ চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে আরও বেশি নজর দিতে হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও পরিচ্ছন্ন দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে ৮১তম ফাউন্ডেশন ট্রেনিং কোর্স সম্পন্ন করা কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সুখ, শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও সাফল্য কামনা করেন।