Thursday 07 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চীনের অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে সিপিপিসিসি’র ভূমিকা

অপূর্ব কুমার, সাংহাই থেকে ফিরে
৫ মে ২০২৬ ০৮:১০ | আপডেট: ৫ মে ২০২৬ ১১:৫৭

চীনের সাংহাই শহর – ছবি : সারাবাংলা

আজকের বিশ্বে চীনের যে অভাবনীয় উত্থান, তা একদিনে সম্ভব হয়নি। বর্তমানে অস্থির বিশ্বব্যবস্থায় গণতন্ত্রসহ অন্যান্য শাসন ব্যবস্থা যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ নানা ক্ষেত্রে হোঁচট খাচ্ছে। সেখানে শান্ত এবং ধীরস্থির গতিতে এগিয়ে চলছে চীন। আর সেটি সম্ভব হয়েছে সরকার এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও পরামর্শমূলক শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে দুইপক্ষের মধ্যে সেতু বন্ধন হিসেবে কাজ করেছে ‘চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স’ (সিপিপিসিসি)।

সিপিপিসিসি’র উৎপত্তি

বিগত ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে যখন গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা হয়, এরও আগে সিপিপিসিসি-র প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছিল বলে সাংহাইয়ের সিপিপিসিসি-র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে সাংহাই সফরে আসা সাংবাদিক প্রতিনিধিদের কাছে তারা একথা জানান। কর্মকর্তারা এই সময়ে সিপিপিসিসি’র গঠন থেকে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন।

বিজ্ঞাপন

কর্মকর্তারা জানান, ১৯৪৯ সালের গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠারর আগে সিপিপিসিসির আহবান করা সভায় নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা করার জন্য রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক খাতের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়েছিলেন।

সিপিপিসিসির ওই সভাটি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) নেতৃত্বে বহুদলীয় সহযোগিতা ও রাজনৈতিক পরামর্শ ব্যবস্থার সূচনা করেছ। যা পরবর্তী দশকগুলোতে সিপিপিসিসি একটি “ব্যাপক দেশপ্রেমিক ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট সংগঠন”-এ রূপান্তরিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন কণ্ঠস্বরকে একত্রিত করা।

মত বিনিময় সভায় কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সিপিপিসিসি-র সাংহাই কমিটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ব্যবসা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক সংগঠনসহ ৩২টি খাত থেকে আসা ৮০০-রও বেশি সদস্য রয়েছেন। সদস্যদের আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে নির্বাচনী অর্থে কোনো গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে অবদান রাখার প্রত্যাশা করা হয়।

সিপিপিসিসি যেভাবে কাজ করে

সাংহাই কমিটির কর্মকর্তারা জানান, সিপিপিসিসি মূলত আলোচনা বা কনসালটেশনের মাধ্যমে কাজ করে। সংগঠনটির সদস্যদের মতো চীনের সরকারও মনে করে আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। কমিটির সদস্যরা গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ঘুরে বেড়ান, তথ্য সংগ্রহ করেন। গবেষণা পরিচালনা, সেমিনার আয়োজন করেন এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশল থেকে শুরু করে স্থানীয় সম্প্রদায়ের উদ্বেগ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব জমা দেন। এরপর সরকার ওই প্রস্তাবগুলোর পাশ করেন অথবা পরবর্তীতে আরও যাচাই-বাছাইয়ের রেখে দেন।

সংগঠনটির প্রধান ভূমিকা হলো চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা — অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের রূপরেখা প্রদানকারী কেন্দ্রীয় নীতি কাঠামো—সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া। চীনের প্রথম এই ধরনের পরিকল্পনা ১৯৫৩ সালে চালু হয়েছিল এবং ২০২৬ সাল এর ১৬তম চক্রের সূচনা করবে। আর এভাবেই এগিয়ে চলছে চীন। মূলত সংগঠনটির পরামর্শমূলক প্রস্তাবগুলোই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে থাকে।

কর্মকর্তারা সাংবাদিক প্রতিনিধিদলকে জানান, পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক মতামত গ্রহণ করা হয়। একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা আমাদের সদস্যদের গবেষণা পরিচালনা এবং সেমিনার আয়োজনের জন্য সংগঠিত করি। সমাজের কী প্রয়োজন তা আমরা শুনি, যাতে আরও ভালো পরিকল্পনা তৈরি করা যায়।

চীনের সাংহাই শহর – ছবি : সারাবাংলা

বর্তমান পরিকল্পনা চক্রের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শত শত সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ফুড ডেলিভারির মতো উদীয়মান খাতের কর্মীদের নিয়ে অধিবেশনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র সাংহাইতেই প্রায় ২ লক্ষ ডেলিভারি ড্রাইভার রয়েছেন এবং তারা যুক্তি দেন যে নীতি নির্ধারণের জন্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। ফলস্বরূপ, ডেলিভারি ড্রাইভাররাও সিপিপিসিসি-র সদস্য।

পরামর্শের ওপর এই গুরুত্বকে চীনের শাসন মডেলের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয় – যা পরোক্ষভাবে, ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনকারী নির্বাচনী ব্যবস্থাগুলোর বিপরীত। এক কর্মকর্তা সন্তান লালন-পালনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, উন্নয়নে সময় লাগে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। কিছু দেশে, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের কারণে এটি কঠিন হয়ে পড়ে।

কারা হতে পারেন

কর্মকর্তারা জানান, সংগঠনটির সদস্য হতে পারেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি থাকে সংগঠনটিতে। শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকোশলী, সরকারি চাকরিজীবীসহ কমিটিতে সবশ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। কমিটির সদস্যদের সন্মানীও রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

সিপিপিসিসি সম্পর্কে এক ব্রিফিংয়ে একজন কর্মকর্তা ব্যাখ্যা করেন, সিপিপিসিসি জাতীয় শাসন ব্যবস্থার একটি অংশ। কিন্তু এর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নেই। আমাদের ভূমিকা হলো প্রস্তাব ও পরামর্শ প্রদান করা এবং আলোচনার মাধ্যমে জনস্বার্থের বিষয়গুলোর সমাধান করা।

ধারণাটি কীভাবে আসে

সিপিপিসিসি’র প্রাথমিক ধারণাটি আসে সাংহাইয়ের স্কুলের পাশের রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালকে ঘিরে। কীভাবে যানজট হচ্ছে, কেনই বা যানজট হচ্ছে, উত্তরণের উপায় খুঁজতে গিয়েই সংগঠনটির ধারণা আসে। মূলত সংগঠনের এক সদস্যর পরামর্শে এই প্রাথমিক সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়। এরপর থেকে আরও সমস্যা এবং সুপারিশ একসঙ্গে জমা করেন। পরে তা সরকারের কাছে উত্থাপন করা হয়। আর এভাবেই চীনের ‘পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াভিত্তিক গণ-গণতন্ত্র’ বাস্তবে কাজ শুরু করে।

সাংহাইয়ের সিপিপিসিসি অফিস পরিদর্শনকালে একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র পরিদর্শন করে, যাকে চীনা কর্মকর্তারা ‘পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াভিত্তিক গণ-গণতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন। এই কেন্দ্রটি, যা একইসাথে একটি কর্মকেন্দ্র এবং জনসাধারণের জন্য প্রদর্শনী, তাকে ‘একটি জানালা ও পাঁচটি প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যেখানে দর্শনার্থীরা দেখতে পারেন পরামর্শ প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে কাজ করে।

চীনের সাংহাই শহর – ছবি : সারাবাংলা

একটি দেয়ালে রিয়েল-টাইম ডেটাতে এই ব্যবস্থার ব্যাপকতা তুলে ধরা হয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, বিগত ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে ২৬০টিরও বেশি পরামর্শ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর পাশাপাশি অসংখ্য বিদেশী প্রতিনিধিদলও এখানে সফর করেছে। একজন নারী কর্মকর্তা গণমাধ্যম দলটিকে বলেন, আজকের পর আপনাদের সফরটিও এতে যুক্ত করা হবে।

এই কেন্দ্রটি নাগরিক এবং দর্শনার্থী উভয়কেই দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ নির্বাচিত কিছু বিষয়ে ডিজিটালভাবে পরামর্শ জমা দেওয়ার সুযোগ দেয়। কর্মকর্তারা বলেন, এটি শাসনব্যবস্থাকে দৃশ্যমান এবং পারস্পরিক মতবিনিময় করার একটি প্রচেষ্টা।

ছোট সমস্যা থেকে বড় পরিকল্পনা

যদিও জাতীয় কৌশলগুলোই খবরের শিরোনামে প্রাধান্য পায়, কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে সিপিপিসিসি-র কাজ দৈনন্দিন সমস্যা পর্যন্ত বিস্তৃত। সাংহাইয়ের রাস্তায় ট্র্যাফিক লাইটের উদাহরণটি ছিল এমনই একটি ঘটনা। আরেকটি উদাহরণ হলো আবাসিক এলাকার অব্যবহৃত জমিকে ‘বাসস্থান উদ্যানে’ রূপান্তরিত করা। সাংহাইয়ের একটি পাড়ায়, আবর্জনার স্তূপে ভরা একটি অবহেলিত জায়গা নিয়ে প্রায়শই অভিযোগ আসত। পরে বাসিন্দা, ডিজাইনার, স্বেচ্ছাসেবক এবং সরকারি বিভাগগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে জায়গাটিকে দেশীয় গাছপালা দিয়ে একটি সবুজ এলাকায় নতুন করে ডিজাইন করা হয়। তবে এই প্রক্রিয়াটি এতোট সহজ ছিল না। কিছু বাসিন্দা বন্যপ্রাণীর আকর্ষণ এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

কর্মকর্তারা বলেছেন, আরও আলোচনা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই উদ্বেগগুলো সমাধান করা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, মূল বিষয় হলো মানুষের মতামত শোনা। যখন তা হয়, তখন তারা এর মালিকানা অনুভব করে এবং প্রকল্পটি রক্ষণাবেক্ষণে আরও বেশি ইচ্ছুক হয়।

গবেষণা ও প্রতিনিধিত্ব

কর্মকর্তারা জোর দিয়েছেন, নানা স্তর থেকে যে প্রস্তাবগুলো আসতো তা অবশ্যই গবেষণার উপর ভিত্তি করেই হতো। শুধুমাত্র গত বছরেই, সাংহাইতে সিপিপিসিসি-নেতৃত্বাধীন দলগুলো উৎপাদন, রিয়েল এস্টেট, বিদেশি বিনিয়োগ এবং বায়োটেকনোলজির মতো বিভিন্ন খাতের ১৭০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছে।

এই পরামর্শ কার্যক্রম শহরে বসবাসকারী প্রবাসীদের পর্যন্তও বিস্তৃত। প্রায় ৩০ হাজারের জনসংখ্যার একটি জেলায়—যার অর্ধেকই বিদেশি বাসিন্দা—কর্মকর্তারা বলেছেন যে তারা সক্রিয়ভাবে অ-চীনা অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে মতামত চেয়ে থাকেন।

একটি উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাবিদ্যার একজন দক্ষিণ কোরীয় বিশেষজ্ঞ প্রদর্শনী স্থানটি পরিদর্শন করার পর বলেছিলেন যে, এই ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে তিনি একটি স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন। কর্মকর্তাদের মতে, তিনি এই উপলব্ধি লাভ করেছেন যে, এই প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের অর্থ হলো কথা বলার এবং নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ থাকা।

সামগ্রিক প্রক্রিয়াভিত্তিক গণ-গণতন্ত্র

চীনা কর্মকর্তারা বলেন, এটিকে দীর্ঘদিনের অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মূল ধারণাটি হলো, জনগণের অংশগ্রহণ কেবল পর্যায়ক্রমিক ভোটদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, নীতি নির্ধারণী চক্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত—পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও তদারকি পর্যন্ত—পুরো প্রক্রিয়া জুড়েই হওয়া উচিত।

শি জিনপিং তার ‘গভর্নেন্স অফ চায়না’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে বলেছেন: গণতন্ত্র কোনো সাজসজ্জার অলঙ্কার নয়; এটি জনগণের কাঙ্ক্ষিত সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো মতামতের জন্য একাধিক মাধ্যম তৈরি করা: যেমন—কমিউনিটি সভা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, গবেষণা পরামর্শ এবং খাতভিত্তিক আলোচনা। এর মধ্যে এই মতামতগুলোকে আনুষ্ঠানিক শাসন প্রক্রিয়ার সাথে একীভূত করাও অন্তর্ভুক্ত।