গাইবান্ধা: জাতীয় বাজেটের অঙ্ক, রাজস্ব বা ঘাটতির হিসাব নিয়ে ভাবেন না ৫৭ বছর বয়সি মনসুর আলী। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট এলাকায় যমুনার তীরে বালু ভরাটের কাজ করা এই শ্রমিকের কাছে বাজেটের অর্থ একটাই—নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না।
সম্প্রতি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। বাজেট ঘিরে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের নানা আলোচনা থাকলেও নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের প্রধান প্রত্যাশা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমা।
গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে কাজের ফাঁকে মনসুর আলী বলেন, ‘হামরা (আমরা) বাজেটের হিসাব-নিকাশ বুঝি না। এতো ট্যাকার বাজেট কী সেটা জানি না। হামরা শুধু দেখি বাজারে গেলে কতো টাকা লাগছে। জিনিসপত্রের দাম কমলে বুঝব আমাদের জন্য ভালো হচ্ছে।’
মনসুর আলীর মতো অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের কাছেই বাজেট কোনো বড় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; বরং মাস শেষে সংসারের খরচ সামাল দেওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক।
গাইবান্ধা পৌর শহরের রিকশাচালক আব্দুল কাদের বলেন, ‘সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় করি, তার বেশিরভাগই বাজারে চলে যায়। আগে যে টাকায় এক সপ্তাহ চলত, এখন সেটা কয়েকদিনেই শেষ হয়ে যায়। বাজেট দিলে যদি বাজার একটু কমে, সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় লাভ।’
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী শাহানা বানু বলেন, ‘বেতন বাড়লেও খরচ তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল সবকিছুর দাম বেশি। বাজেটের পরে যদি বাজারে কোনো পরিবর্তন আসে, তাহলে সাধারণ মানুষ একটু স্বস্তি পাবে।’
ভ্যানচালক নূর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের আয় প্রতিদিন একরকম থাকে না। কোনো দিন ভালো, কোনো দিন খারাপ। কিন্তু খরচ কমে না। বাজেটের কথা শুনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখি বাজারে দাম কত।’
পৌর পার্কের ভাসমান খেলনা ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রেতারা এখন আগের মতো কিনতে পারে না। দাম বাড়লে আমাদের বিক্রিও কমে যায়। বাজার স্থিতিশীল থাকলে সাধারণ মানুষও উপকার পাবে, ব্যবসায়ীরাও টিকে থাকবে।’
গৃহিণী সেলিনা খাতুন বলেন, ‘সংসারের বাজেট এখন প্রতি মাসে নতুন করে করতে হয়। সন্তানদের পড়াশোনা, খাবার, চিকিৎসা সব মিলিয়ে খরচ সামলানো কঠিন। আমরা চাই জিনিসপত্রের দাম আর না বাড়ুক।‘
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের মতে, বাজেট মূলত সরকারের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা। তবে সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের বাস্তব অর্থ তখনই তৈরি হয়, যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে, কর্মসংস্থান বাড়ে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।