নীরবতায় মোড়ানো রাত। সকলে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু জেগে থাকেন একজন। জেগে থাকাটাই তার দায়িত্ব। পরিশ্রমে মলিন তার চেহারা, ক্লান্ত চোখে জীবনের লড়াইয়ের ছাপ। গত ১৮ বছর ধরে অবিরত কাজ করে যাচ্ছেন পরিবারকে সচ্ছলতার মুখ দেখাতে। এতক্ষণ যার কথা বলছি, তিনি হলেন সরকারি তিতুমীর কলেজের কর্মচারী কল্যাণ মারমা, যিনি গত আঠারো বছর ধরে নীরবে এই প্রতিষ্ঠানকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
আতা মিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল বান্দরবানের গহীনে। পড়াশোনা মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি। অভাবের সংসারে দারিদ্র্যের চাপে নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ পাননি।
আঠারো বছর ধরে তিতুমীর কলেজে চাকরি করছেন কল্যাণ মারমা। প্রথমে অফিস সহকারী হিসেবে চাকরিতে ঢুকলেও বর্তমানে তিনি সামলাচ্ছেন তিতুমীর কলেজের নৈশ প্রহরীর দায়িত্ব। দায়িত্বের ভার বাড়লেও বাড়েনি তার বেতনের চাকা। বেতনের কথা জিজ্ঞেস করায় প্রথমে লজ্জায় বলতে চাননি। পরে পাল্টা প্রশ্নে আক্ষেপের সুরে বলেন, “চাকরিতে প্রবেশ করার সময় বেতন ছিল ৪,১০০ টাকা। আঠারো বছর পর তা এসে দাঁড়িয়েছে ১২,৪৫০ টাকায়।”
দুই সন্তানের জনক কল্যাণ মারমা, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। মেয়েটি পড়াশোনা করছে সপ্তম শ্রেণিতে এবং ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। ছেলে-মেয়েকে নিয়ে আতা মিয়ার স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই টাকা দিয়ে আর কী স্বপ্ন দেখবো? নিজে বেশি পড়াশোনা করতে পারিনি, কিন্তু আমি চাই আমার ছেলে-মেয়েরা অনেক বড় হোক, তারা পড়াশোনা করে মানুষ হোক।”
১৮ বছরে মাত্র ৮৩৬০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান ১২৪৫০ টাকা বেতন দিয়ে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। পাল্টা প্রশ্নে জানতে চাইলাম দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প। কল্যাণ মারমা শোনালেন ভিন্ন গল্প। তিতুমীর কলেজে চাকরির পাশাপাশি আতা মিয়া ও তার স্ত্রী মিলে গড়ে তুলেছেন পাহাড়ি খাবার বিক্রির একটি দোকান। স্বামী-স্ত্রীর সমন্বয়ে চলছে এই দোকান। দোকান ও চাকরি থেকে যা আসে, তা দিয়েই চলে আতা মিয়ার সংসার।
হঠাৎ করেই অফিস সহকারী থেকে নৈশ প্রহরীর দায়িত্ব দেয়া হয় কল্যাণ মারমা, দায়িত্ব বাড়লেও বেতন বাড়েনি। তিনি বলেন, প্রতিবছর বেতন বাড়ানোর কথা বললে প্রশাসন বলে, “থাকতে চাইলে থাকো, না হলে চলে যাও।” আক্ষেপের সুরে আরও বলেন, ২৪ অভ্যুত্থানের পরে কর্মচারীদের জন্য ‘ঝুঁকি ভাতা’ নামে একটি ফান্ড সরকার থেকে কলেজ প্রশাসনের কাছে এলেও তার কোনো অংশই তারা পাননি।
এই নীরব প্রহরীর হাত ধরেই কলেজের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। গভীর রাত জেগে, প্রচণ্ড শীতের মাঝেও আতা মিয়া বসে থাকেন দায়িত্বে। করুণ চোখে তাকিয়ে তিনি বলেন, প্রচণ্ড মশার উৎপাত,কয়েল কেনার টাকাটুকুও নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়।
কল্যাণ মারমাদের মতো মানুষদের নিরলস শ্রম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলোর পেছনে থাকে এমন অমূল্য শ্রম।