Wednesday 06 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইতালি প্রবাসীর হত্যা মামলাটি ‘রাজনৈতিক’ নয়, ন্যায় বিচার দাবি পরিবারের

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৬ মে ২০২৬ ২১:৩৮

– ছবি : সংগৃহীত

ফরিদপুর: জেলায় পাঁচ বছর আগে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীর হাতে মাসুদ রানা নামে ইতালী প্রবাসীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলাটি রাজনৈতিক মামলা বলে প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দফতরে সুপারিশ করা হয়েছে।

বিষয়টি জানতে পেরে ন্যায় বিচার চেয়ে মঙ্গলবার (৫ মে) ফরিদপুর প্রেসক্লাবে ভুক্তভোগী পরিবার সংবাদ সম্মেলন করেছে।

লিখিত বক্তব্যে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধান আসামী ইমদাদুল হক বাচ্চু ১৫ বছর যাবৎ ভাঙ্গা পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। সে সহ অন্যান্য আসামীরা চলমান হত্যা মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক হিসাবে অপপ্রচার চালিয়ে তা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। মামলাটি প্রমাণিত ও বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতাশালী লোকের তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে সুপারিশ করা হয়েছে। এমতাবস্থায় ‘রাজনৈতিক মামলা’ হিসেবে গণ্য না করে ‘হত্যা মামলা’ হিসেবে বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছে পরিবার।

বিজ্ঞাপন

সংবাদ সম্মেলনে নিহতের বৃদ্ধা মা হালিমা বেগমের (৭৫) পক্ষে লিখিত বক্তব্য রাখেন তার ছোট ছেলে আসাদুজ্জামান। এ সময় নিহতের স্ত্রী শাহীন আফরোজ রোজা ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মাসুদা মেহেরুবা (৫) সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা।

সংবাদ সম্মেলনে নিহতের হালিমা বেগম জানান, ২০০৪ সাল থেকে ১৮ বছর যাবৎ তার ছোট ছেলে মাসুদ রানা (৪৫) ইতালিতে বসবাস করে আসছিলেন। এরপর ২০১৭ সালে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যান সেখানে। এরমধ্যে ২০২১ সালে দেড়মাসের ছুটিতে দেশে আসেন মাসুদ রানা। তৎকালীন সময়ে তাদের গ্রামে দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে তিনি উদ্যোন নেন। এতে গ্রাম্য মোড়ল ও পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চু গ্রুপ তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। যারপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল রাতে প্রথম রমজানের তারাবি নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ভাঙ্গা উপজেলার নওপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দলবল নিয়ে ধারালো অস্ত্র চাপাতি, রামদা নিয়ে তার ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় ১৫ এপ্রিল ৩৫ জনকে আসামী করে ভাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তিনি।

ওই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর হত্যাকান্ডের বিবরণ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও হত্যাকান্ডের ব্যবহৃত একটি ধারালো ছুড়ির ফরনেসিক প্রতিবেদনসহ ৩৪ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন- তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. ফরহাদ হোসেন।

এছাড়া অভিযোগপত্রে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুর (৬০) নেতৃত্বে ও নিজেই কুপিয়ে জখম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের উপস্থাপিত অভিযোগপত্রেও বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। পরবর্তীতে ফরিদপুর অতিরিক্ত দায়রা জজের ২য় আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে এবং ৯ জনের স্বাক্ষ্য চলমান বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কন্ঠে বৃদ্ধা হালিমা বেগম ছেলে হত্যার ন্যায়-বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার দাবি- আমি জীবিত থাকতে যেন ন্যায্য বিচারটা পাই। আমার ছেলের শোকে চার মাস পর আমার স্বামীও স্ট্রোক করে মারা গেছে। এই মামলা কিভাবে রাজনৈতিক মামলা হয়। এই মামলা তদন্ত করে দেখুক, আমার ছেলের কোনো দোষ ছিল কি-না।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সাথে জড়িতও ছিল না এবং বাংলাদেশের ভোটারও ছিল না। এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতেন, গরীব মানুষের পাশে দাড়িয়েছিল, তাঁদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতায়ও করত। তাকে এমনভাবে মারছে যে একটি দোকানে গিয়ে পালিয়েছিল, সেখানে ঢুকে ওই বাচ্চু লোকজন নিয়ে মারছে। এই মামলা কিভাবে রাজনৈতিক মামলা হয়, আমি জানি না।’

নিহতের ভাই আসাদুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, আমার ভাইকে যারা কুপিয়ে হত্যা করেছে, তারা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাকর্মী। তারা সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার ভয়ে বর্তমানে ভোল্ট পাল্টিয়ে ক্ষমতাশালী দলের নেতাদের সাথে মিশে এবং তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে সুপারিশ করিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক আসামীই আমার ভাই হত্যার সাথে জড়িত রয়েছে, যেটা দিনের আলোর মতো পরিস্কার।’

জানা যায়, এদিকে সকল আসামীর নামসহ চলতি বছরে রাজনৈতিক মামলা উল্লেখ করে প্রত্যাহারের আবেদন করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদারেরস আলী ইছা। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল জেলা ‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহার সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই’ কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়।

ওই সুপারিশপত্রে স্বাক্ষর করেন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা (সাবেক), সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস, সদস্য ও পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আশরাফুজ্জামান নান্নু।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবেদনকারী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদারেরছ আলী ইছা বলেন, ‘একজন ভাল-মন্দ বলতেই পারে। আবেদনের পরে এটা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা রিপোর্টের ভিত্তিতেই সুপারিশ করা হয়েছে।’ এছাড়া প্রধান অভিযুক্ত আওয়ামীলীগ নেতার বিষয়ে তিনি বলেন- ‘আমিতো আর সারাদেশের মানুষ চিনি না, কে কোন দল করে।’

যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে প্রথমে একটি লোকাল তদন্ত হয়েছে এবং পরে পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করে এবং নিয়মতান্ত্রিক অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরিবারটি যদি প্রথমদিকে আমাদের জানাতেন, তাহলে আমরা পুনরায় তদন্তে পাঠাতাম। এখন তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আপত্তি জানাতে পারেন এবং আপত্তি অনুযায়ী পুনরায় তদন্তে দেয়া হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর