Thursday 14 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আসছে ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’

গোলাম সামদানী হেড অব নিউজ
১৪ মে ২০২৬ ২২:১৮

ঢাকা: ছয় দশকের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিএনপি সরকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বহুল প্রতিক্ষীত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। তবে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়ন ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ মেয়াদে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এটিই প্রথম কোনো মেগা প্রকল্প।

বিজ্ঞাপন

পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাত কোটি মানুষের ভাগ্য পরিববর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে, কমবে লবণাক্ততা, প্রাণ ফিরে পাবে মৃতপ্রায় নদীগুলো—একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। এর আগে বেশ কয়েক দফা প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপন করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। অবশেষে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় গ্রহনের মাত্র তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে এই ধরনের একটি জনবান্ধব বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীগুলোর আশপাশের ২৪টি জেলার পানিসঙ্কট নিরসন হবে, যার ফলে প্রায় সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবে।’

ব্যারাজ কী?

সাধারণত ‘ব্যারাজ’ হলো নদী বা জলাধারের ওপর আড়াআড়িভাবে নির্মিত বিশেষ একটি অবকাঠামো। যার মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সাধারণত ব্যারাজ নির্মাণের সময় তার উজানে এক বা একাধিক কৃত্রিম খাল খনন করা হয়। এরপর পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ওইসব খালে পানি ঢোকানো হয়। সেই পানি পাম্পের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সেচ আকারে দেওয়া হয়। আবার কখনো কখনো ব্যারাজের মাধ্যমে এক নদীর পানি অন্য নদীতে নিয়ে সেটির প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে সরকার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করেছে।

ব্যারাজের সাথে ড্যাম বা বাঁধের পার্থক্য

সাধারণ ড্যাম বা বাঁধের সঙ্গে ব্যারেজের প্রধান পার্থক্যে হলো- বাঁধের মাধ্যমে সাধারণত জলাধারের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গাজুড়ে পানি সংরক্ষণ করা হয়। আর ব্যারাজের মাধ্যমে পানির প্রবাহ বন্ধ করার পরিবর্তে সেটির গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কখনো কখনো অবকাঠামোতে একাধিক দরজা বা গেইট রাখা হয়, যেখান দিয়ে পানি প্রবাহিত করা হয়।

বাংলাদেশে কি কোন ব্যারেজ আছে

বাংলাদেশে একাধিক জেলায় ছোট আকারের বেশ কয়েকটি ব্যারাজ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৩ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদীর ওপর প্রথমবার একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়। এটি ‘মনু ব্যারাজ’ নামে পরিচিত। এছাড়াও ১৯৯০ সালে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর ওপর ‘তিস্তা ব্যারাজ’ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙ্গন নদীর ওপর ‘টাঙ্গন ব্যারাজ’ নিমার্ণ করা হয়।

কোথায় হচ্ছে পদ্মা ব্যারাজ

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় মূল অবকাঠামোটি নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রায় দুই দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ ওই ব্যারেজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দু’টি ফিশ পাস রাখা হবে। এর মধ্যে ব্যারাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত যে কাঠামোর মাধ্যমে নদীর অতিরিক্ত পানি বাইরে বের করে দেওয়া হয়, সেটাই হলো স্পিলওয়ে। আর আন্ডার স্লুইস হলো ব্যারাজের পানির প্রবাহ ও পলি ব্যবস্থাপনার জন্য নির্মিত আরেকটি বিশেষ কাঠামো। যে নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়, সেটির পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টনের জন্য যে বিশেষ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়ে থাকে, সেটি ‘অফটেক অবকাঠামো’ নামে পরিচিত। একইসঙ্গে, প্রথম ধাপের কর্মকাণ্ডের আওতায় গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ দশমিক ছয় কিলোমিটার এবং হিসনা নদীতে ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং ড্রেজিং কাজ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

কোন কোন জেলার মানুষ উপকৃত হবে

পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের চার বিভাগের ২৬টি জেলার ১৬৩টি উপজেলার মানুষ প্রত্যেক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়নে চার বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলা উপকৃত হবে। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা, ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ, রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার জনগণ এর সুফল ভোগ করবে।

পদ্মা ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা কেন

১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ফলে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন, বনায়ন, নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী শুকিয়ে গেছে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদী ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা কমবে, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা পাবে এবং প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় ধান প্রায় ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং প্রায় ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বার্ষিক আনুমানিক প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন অর্জন হবে।

বিভিন্ন সময়ে পদ্মা ব্যারাজের সমীক্ষা

১৯৬০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অন্তত চার দশকে ব্যারাজের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল। বিএনপি সরকারের গত মেয়াদে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়। এরপর ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় ও বিদেশী বিশেষজ্ঞদের একটি দল সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নে কাজ করে।

সূত্র: সরকারি তথ্যের পাশাপাশি দেশ-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম।

বিজ্ঞাপন

আরো

গোলাম সামদানী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর