ঢাকা: দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থাকে সারা দেশে বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকরা যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)–এর অ্যাপ ব্যবহার করে একই কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারবেন। এর জন্য মার্চেন্ট বা গ্রাহক—কারও নতুন কোনো অ্যাপ বা সফটওয়্যার ইনস্টল করার প্রয়োজন হবে না।
রোববার (২৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশে একটি ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ‘বাংলা কিউআর’।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের আলাদা আলাদা কিউআর ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি ইউনিফাইড কিউআর চালু করা হয়েছে। ফলে একজন গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থেকেই একই কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এতে লেনদেন আরও সহজ ও দ্রুত হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলা কিউআর কোনো নতুন অ্যাপ নয়। তাই এটি ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত কোনো সফটওয়্যার ডাউনলোড বা ইনস্টল করার প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান অ্যাপ ব্যবহার করেই এই সেবা গ্রহণ করা যাবে।
তিনি জানান, বাংলা কিউআর চালু হলে খুচরা বাজারে নগদ টাকার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে ছেঁড়া নোট, ময়লা টাকা কিংবা খুচরা টাকার সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও কমে আসবে। দৈনন্দিন লেনদেন আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত হবে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাংলা কিউআর ছড়িয়ে দেওয়া এবং ছোট ব্যবসায়ী, চালক ও প্রান্তিক বিক্রেতাদের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেন নিয়ে যে সংশয় রয়েছে, তা দূর করা।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো অনানুষ্ঠানিক বা ইনফর্মাল লেনদেনের পরিমাণ অনেক বেশি। এই লেনদেনগুলোকে যদি আনুষ্ঠানিক বা ফর্মাল ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত আকার আরও বড় হবে এবং বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, অর্থনীতির প্রকৃত আকার ও টার্নওভারের সঠিক তথ্য দৃশ্যমান হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে। এতে তারা বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।
বাংলা কিউআর ব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে খরচ ও ক্যাশআউট চার্জ নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, বাংলা কিউআর নিজে কোনো অ্যাপ নয়, তাই এটি ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনো খরচ নেই।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ টাকার ব্যবহার ধীরে ধীরে নিরুৎসাহিত করতে চায়। এজন্য ভবিষ্যতে ক্যাশআউটনির্ভর লেনদেন কমিয়ে আনার বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে নগদ লেনদেনকে তুলনামূলক বেশি ব্যয়বহুল করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে, যাতে মানুষ ডিজিটাল পেমেন্টে আরও বেশি উৎসাহিত হয়।
মুখপাত্র আরও বলেন, কোনো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) যেন বাংলা কিউআরের সুবিধা ব্যবহার করে ক্যাশআউটকেন্দ্রিক ব্যবসা বা অন্য কোনো অপব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক রয়েছে। প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও তদারকির মাধ্যমে এসব অপব্যবহার রোধ করা হবে।
তিনি বলেন, বাংলা কিউআর-কে সফল করতে শুধু প্রচারণা যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন যথাযথ নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, ব্যাংক, এমএফএস প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরিফ হোসেন খান আশা প্রকাশ করেন, সবার সহযোগিতা পেলে বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনবে এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।