Friday 25 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

যশোরে ডেঙ্গুর বিস্তার / শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে আক্রান্ত বেশি

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১৭

যশোর: ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে যশোরে। প্রতিদিনই শনাক্ত হচ্ছেন নতুন রোগী। সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০১ জন ডেঙ্গু রোগী। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও শতাধিক। চলতি মৌসুমে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৮ জন। মারা গেছেন তিনজন।

যখন সংক্রমণ বাড়ছে তখনই জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে নেই কোনো কীটতত্ত্ববিদ। প্রায় দুই বছর ধরে শূন্য রয়েছে পদটি। ফলে কোথায় এডিস মশার প্রজননস্থল, কোন এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি কিংবা কীভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে, সেসব বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক জরিপ বা বিশ্লেষণ করতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এটি বড় ধরনের দুর্বলতা।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি এমন জেলার মধ্যে যশোর অন্যতম। উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আরেকটি তথ্য তা হলো, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলেই এখন রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে অভয়নগরে ১০ জন, কেশবপুরে ৮ জন, বাঘারপাড়ায় ৬ জন, মণিরামপুরে ৪ জন, শার্শায় ৩ জন ও ঝিকরগাছায় একজন রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি মৌসুমে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৮ জনে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ১৬৬ জন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ১৯ জনকে। মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অভয়নগর উপজেলায়। চলতি মৌসুমে সেখানে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৫৭৩ জন।

ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে হাসপাতালগুলোতে। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় রোগীদের পুরুষ ও নারী মেডিসিন ওয়ার্ডেও ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ২০ শয্যার বিশেষ ওয়ার্ড চালু থাকলেও রোগী বেড়ে যাওয়ায় সেই সক্ষমতা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। বর্তমানে ডেঙ্গু ওয়ার্ড এবং পুরুষ-নারী মেডিসিন ওয়ার্ড মিলিয়ে ৫১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৪৩ জন রোগী। এর মধ্যে ২৩২ জন পুরুষ ও ৩১১ জন নারী। চিকিৎসকদের ভাষ্য, জ্বর নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যাই বেশি। প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োজিত রয়েছেন। ওষুধ ও স্যালাইনের কোনো সংকট নেই। তবে মানুষ সচেতন না হলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের মতে, চারটি প্রধান কারণে যশোরে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, যশোর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রেন, বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক নিয়মিত এখানে আসে। এসব যানবাহনের মাধ্যমে এডিস মশার বিস্তার ঘটার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ট্রাকের পেছনের অংশ, গ্যারেজ এলাকা ও পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এ ছাড়া ভারত ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যাতায়াতকারী মানুষের চাপও এখানে বেশি। উন্নত চিকিৎসাসেবা থাকায় আশপাশের জেলা থেকেও ডেঙ্গু রোগীরা যশোরে চিকিৎসা নিতে আসেন।

তার মতে, অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টি সংক্রমণ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। নেই মশার উৎস শনাক্তের বৈজ্ঞানিক নজরদারি

ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হলেও জেলায় এডিস মশার ঘনত্ব, লার্ভার বিস্তার কিংবা সংক্রমণের উৎস নিয়ে কোনো সাম্প্রতিক জরিপ হয়নি। কারণ, দুই বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে কীটতত্ত্ববিদের পদ।

অবসরপ্রাপ্ত জেলা কীটতত্ত্ববিদ আমিনুল হক বলেন, যশোর শহর, মহাসড়ক এলাকা, পরিত্যক্ত টায়ার, বিভিন্ন ভবনের ছাদ, নওয়াপাড়া ও বেনাপোল বন্দর এলাকায় নিয়মিত এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও এখন এডিসের উপস্থিতি স্পষ্ট। গ্রামাঞ্চলে এডিস অ্যালবোপিকটাস বেশি পাওয়া যায়। শহরে বেশি থাকে এডিস ইজিপটাই। ডেঙ্গু বিস্তারে দুটি প্রজাতিই ভূমিকা রাখে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নিয়োগ হয়নি।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, প্রথম দিকে ঢাকা থেকে আসা রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। পরে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকছে। এতে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। অক্টোবর মাসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর