রাজবাড়ী: পদ্মার বুকে নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতা, নদীর পাড়ে গ্রামীণ মেলা আর মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে কাটছে রাজবাড়ীতে তিন দিনব্যাপী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলা। দ্বিতীয় দিনেও শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উপচেপড়া ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। দীর্ঘ দুই দশক পর নৌকাবাইচ দেখতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের গোদারবাজার এলাকায় পদ্মা নদীতে এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দিনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সাতটি নৌকা। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো দর্শনার্থী উপভোগ করেন গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে নদীর পাড়ে বসেছে গ্রামীণ মেলা। বিভিন্ন পণ্যের দোকান, ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ও মানুষের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে পুরো এলাকা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেলায় ঘুরে বেড়ানো, পছন্দের জিনিস কেনা এবং নৌকাবাইচ উপভোগের মধ্য দিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা। মেলাকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দেখা গেছে বাড়তি কর্মচাঞ্চল্য।

নৌকাবাইচ দেখতে আসা দর্শনার্থী আলতাফ বলেন, ছোটবেলায় নৌকাবাইচ দেখেছেন, আবারও দেখতে পেরে তার খুব ভালো লেগেছে। নৌকাবাইচ উপলক্ষে মেলা বসেছে, অনেক মানুষ এসেছেন প্রতিযোগিতা দেখতে। প্রতিবছর এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার দাবি জানান তিনি।
চরনারায়ণপুর থেকে নাতিদের সঙ্গে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছিলেন আলম। তিনি বলেন, প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর পর আবার নৌকাবাইচ দেখছেন। দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজন দেখতে পেরে তার খুব ভালো লেগেছে।
মিজানপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি উদযাপন পরিষদের সদস্য প্লাবন আলী বলেন, তিন দিনব্যাপী আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে সাতটি নৌকার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর পর গোদারবাজারে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় তাঁরা আনন্দিত। এ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ায় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি উদযাপন পরিষদের সভাপতি নঈম আনছারী বলেন, একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ মানুষের অন্যতম প্রধান বিনোদন। কালের বিবর্তনে অনেক জায়গায় এ আয়োজন কমে গেছে। দীর্ঘদিন রাজবাড়ীর মানুষও নৌকাবাইচ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এবার এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছর নৌকাবাইচ আয়োজন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা হবে। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপির নেতৃত্বে রাজবাড়ীতে সাংস্কৃতিক চর্চা আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে দ্বিতীয় দিনের নৌকাবাইচে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম তার নেতাকর্মীদের সঙ্গে নৌকায় চড়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন।
প্রসঙ্গত, গত ৮ অক্টোবর বিকেলে গোদারবাজার এলাকায় পদ্মা নদীতে নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী এ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি তুলে ধরা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য আরও জোরদার হবে। উৎসবের শেষ দিনেও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম হবে বলে আশা করছেন তারা।